চসিকের ২,২৬০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

চট্টগ্রাম মহানগরকে ‘ক্লিন, গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ৮৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। একই সঙ্গে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বাজেট ঘোষণা করেন।

বাজেট বক্তব্যে মেয়র বলেন, নগরবাসীর একমাত্র সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। একটি ক্লিন, গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সামর্থ্যের মধ্যে সেই প্রত্যাশা পূরণে চসিক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে চসিকের সদিচ্ছা থাকলেও আর্থিক সক্ষমতা অপ্রতুল। আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া নগরবাসীর শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন। শুধুমাত্র পৌরকরের ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হলে কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে।

সিটি কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মেয়র বলেন, চসিকের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে কর্পোরেশন আরও স্বনির্ভর হবে।

তিনি বলেন, অতীতে অযৌক্তিকভাবে নির্ধারিত গৃহকর যৌক্তিক করতে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে সঠিক ও ন্যায্যভাবে কর নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বন্দর, রেলওয়ে, ৩৬টি কনটেইনার টার্মিনাল, অয়েল কোম্পানি লিমিটেডসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোকে অবশ্যই প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিজস্ব উৎস থেকে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে—বকেয়া কর ১৯৭ কোটি টাকা, হাল কর ৪২৬ কোটি টাকা, অন্যান্য কর ১৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ফি ১৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা, জরিমানা ২ কোটি টাকা, সম্পদ থেকে ভাড়া ও আয় ১০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ব্যাংক স্থিতি থেকে আয় ৫০ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৪৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং বিবিধ আয় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

এ ছাড়া নিজস্ব উৎসের বাইরে ত্রাণ সহায়তা ১০ কোটি টাকা, উন্নয়ন অনুদান ৯৭৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৫২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৮২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে—বেতন-ভাতা ও পারিশ্রমিক ৪৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ভাড়া, কর ও অভিকর ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি ৭৬ কোটি টাকা, কল্যাণমূলক ব্যয় ৩৯ কোটি টাকা, ডাক, তার ও দূরালাপনী ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, আতিথেয়তা ও উৎসব ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বিমা ৪০ লাখ টাকা, ভ্রমণ ও যাতায়াত ১ কোটি ১০ লাখ টাকা, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও মনিহারি ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা, ফি, বৃত্তি ও পেশাগত ব্যয় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণ ব্যয় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, বিবিধ ব্যয় ২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং ভান্ডার ব্যয় ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ত্রাণ ব্যয় ৫ কোটি টাকা, বকেয়া দেনা পরিশোধে ১৮৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, স্থায়ী সম্পদে ১৭১ কোটি টাকা, রাজস্ব তহবিল ও অন্যান্য উন্নয়নে ২১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এডিপি ও অন্যান্য উন্নয়নে ১২৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য ব্যয়ে ২৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছে।

মেয়র বলেন, ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর তিনি ৫৯৬ কোটি টাকা দেনার বোঝা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে দেনার পরিমাণ কমে ৩৮০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে আয়কর বাবদ ৪৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ ৮৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিলে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে আনুতোষিক বাবদ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৪২০ জনকে জনপ্রতি ১ লাখ টাকা করে মোট ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা আনুতোষিক দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম একটি ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। এখানে দূষণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেই দূষণ রোধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গাছ। অনিয়ন্ত্রিত দখল, পাহাড় উজাড় ও বন ধ্বংসের কারণে সবুজ আচ্ছাদন কমে গেছে। তাই সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে অংশ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চট্টগ্রামকে সবুজ-শ্যামল ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ইতোমধ্যে পাঁচ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরে আরও ১০ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।

হকার সমস্যা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, নগরের দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফুটপাত দখল করে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এ সমস্যা সমাধানে নগরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ইপিজেড, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট ও স্টেশন রোড এলাকায় এসব মার্কেট নির্মাণ করা হতে পারে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পাশে খালি জায়গায় হকারদের জন্য ভূমি বরাদ্দের চেষ্টাও চলছে।

তিনি আরও বলেন, বিএফআইডিসি রোডে চসিকের মালিকানাধীন ৮ একর জমি এওয়াজ-বদলের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটি নির্মিত হলে চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেয়র জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত জনবল ৪ হাজার ২২৬ জন। এই জনবল দিয়ে প্রায় ৭০ লাখ নগরবাসীকে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন সময়ে জরুরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে স্থায়ী করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় যুগোপযোগী নতুন জনবল কাঠামো ও নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠানোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে শুধুমাত্র আবেদন ফি গ্রহণ করে ১২০ জন মেধাবী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

বাজেট অধিবেশনে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির চৌধুরীসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত