বন্যা আর নদীভাঙনের মাঝেও চরবাসীর ভরসা গরু-ছাগল পালন

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

বন্যা, নদীভাঙন, খরা এবং কৃষির অনিশ্চয়তার কারণে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় অনেক পরিবার এখন গবাদিপশু পালনকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিচ্ছে। গরু ও ছাগল পালন করে তারা সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করছেন এবং দারিদ্র্য কমাতে সক্ষম হচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত এক দশকে বন্যা ও নদীভাঙনের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীভাঙনের কারণে অনেক ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে কৃষিনির্ভর মানুষের বিকল্প আয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি সদর উপজেলার ঝুনকার চরে এক খামারের গরু পরিদর্শনের সময় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলেন।

খামারি ওসমান গনী জানান, গরু পালন লাভজনক হওয়ায় প্রয়োজনে ঋণ নিলেও গরু বিক্রি করে তা সহজেই পরিশোধ করা যায়। গবাদিপশুকে সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এনজিও থেকেও ঋণ পাওয়া সম্ভব। তার ভাষ্য, একটি বাছুর এক বছর পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়, যা একটি পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা।

বিভিন্ন এনজিও সূত্রে জানা গেছে, পশুপালনের জন্য বীমা সুবিধাও রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয়। বীমাকৃত পশুর ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার গরু, ১১ হাজার মহিষ, ৭ লাখ ৪৫ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৪৯ হাজার ভেড়া এবং ৩ হাজার ২১৬টি ঘোড়া রয়েছে। এর মধ্যে জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ গবাদিপশুই চরাঞ্চলে লালন-পালন করা হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় এসব পশু খোলা মাঠে চরিয়ে পালন করা হয়, যা খাদ্য ব্যয় কমিয়ে খামারিদের লাভ বাড়াতে সহায়তা করে।

ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বর্ষা ও বন্যার সময় গবাদিপশুকে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে রাখতে হবে। আগে থেকেই পর্যাপ্ত শুকনো খাদ্য সংরক্ষণ করা জরুরি। বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ঘাস বা দূষিত খাবার এবং অপরিষ্কার পানি পশুকে খাওয়ানো উচিত নয়। তিনি জানান, বর্ষাকালে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বিশুদ্ধ পানি, পরিষ্কার খাদ্য এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, জুন ও জুলাই মাসে এ অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছালে আগেভাগেই গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদিকে খরার সময়ের জন্য খড় ও ঘাস মজুত রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।

সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রহিম উদ্দিন হায়দার রিপন জানান, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও এবং ভয়েস কলের মাধ্যমে চরবাসীর কাছে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। সাধারণত তারা ৫ থেকে ১০ দিন আগে বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন।

কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার ও জিঞ্জিরামসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় সাড়ে চারশ চর রয়েছে। এসব চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস।

পোড়ার চরের বাসিন্দা জহুরুল হক বলেন, চরাঞ্চলে কৃষিকাজ থেকে খুব বেশি লাভ হয় না। তাই তিনি বর্গায় গরু এনে পালন করেন। বর্তমানে তার চারটি গরু রয়েছে, যেগুলো থেকে বছরে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হয়। পশু অসুস্থ হলে নৌকায় করে বাজারে নিয়ে যাওয়া হয় অথবা প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসকদের সহায়তা নেওয়া হয়।

সাহেবের আলগা চরের কালু মিয়া বলেন, চরাঞ্চলের মানুষকে সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তাই কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন না করলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

পোড়ার চরের নুর জাহান বেগম জানান, তার স্বামী ঢাকায় কাজ করেন আর তিনি বাড়িতে গরু পালন করেন। চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ঘাসে গরু পালনের খরচ কম হওয়ায় ভালো লাভ করা যায়। তিনি আরও বলেন, নারী খামারিরা ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে আবহাওয়ার সতর্কতা পান এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শও পান।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর বলেন, ইউনিয়নের ২৫টি চরে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের বসবাস। কর্মসংস্থানের কারণে অনেক পুরুষ বাইরে থাকায় বাড়িতে থাকা নারীরাই গবাদিপশু পালন করে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। তার মতে, বর্তমানে গবাদিপশু পালন চরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর ঘাস জন্মায়, ফলে গরু-ছাগল পালনে খাদ্য ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদান এবং কারিগরি পরামর্শ দিয়ে খামারিদের সহায়তা করছে। তিনি চরাঞ্চলের মানুষকে গবাদিপশু পালনে আরও উৎসাহিত হওয়ার আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত