দেশের ব্যাংক খাতে অর্থপাচার প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি কয়েকটি ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনে অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছয়টি বিশেষ তদন্ত দল মাঠে নেমেছে। তদন্তের আওতায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক, বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ও প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংক এইচএসবিসি।
বুধবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক লেনদেন, বিশেষ করে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যবহৃত নস্ট্রো হিসাবের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে আমদানির বিপরীতে নস্ট্রো হিসাব থেকে ডলার পরিশোধ করা হলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে ব্যাংকে কোনো ঋণ বা দায় সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে ওই অর্থের প্রকৃত হিসাব ব্যাংকের বইয়ে প্রতিফলিত হয়নি, যা অর্থপাচারের একটি সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া তদন্তে উঠে এসেছে, এসব লেনদেনের তথ্য গোপন করতে ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করছেন। তথ্য পুনরুদ্ধার করে কোন কোন লেনদেন আড়াল করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা বের করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ট্রেজারি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাই শুধু আর্থিক নথিই নয়, সার্ভার লগ, ব্যবহারকারীর কার্যক্রম, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং তথ্য পরিবর্তনের ইতিহাসও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তের জন্য ছয়টি পৃথক বিশেষ দল গঠন করেছে। এসব দলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রতিটি দল নির্দিষ্ট ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন, নস্ট্রো হিসাব, ট্রেজারি কার্যক্রম এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার তথ্য যাচাই করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তে অনিয়ম বা অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও পাঠানো হতে পারে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং অর্থপাচার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর এই বিশেষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, নস্ট্রো হিসাবের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হবে। তাই শুধু দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ট্রেজারি কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একাধিক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নস্ট্রো হিসাব অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। এ হিসাবে কোনো অনিয়ম বা তথ্য গোপনের ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই তদন্তটি নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি।