ফিশিং ও ডিজিটাল প্রতারণা

এক ক্লিকেই খোয়া যেতে পারে টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম

ডিজিটাল জীবনের পরিধি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-মেইলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকরাও বদলে ফেলছে তাদের কৌশল। পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে, ভুয়া লিংক পাঠিয়ে কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ফিশিং, স্ক্যাম ও পরিচয় চুরির মতো প্রতারণা বিশ্বজুড়েই বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। একটু অসতর্কতার কারণে ব্যবহারকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাসওয়ার্ড কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য চলে যেতে পারে অপরাধীদের হাতে।

ফিশিং যেভাবে কাজ করে

ফিশিং হলো এমন এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে অপরাধীরা বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে গোপন তথ্য আদায়ের চেষ্টা করে।

প্রতারকরা সাধারণত ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নামে বার্তা পাঠায়। সেখানে বলা হয়—আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, পুরস্কার পেয়েছেন, জরুরি তথ্য হালনাগাদ করতে হবে বা নিরাপত্তার কারণে লগইন করতে হবে।

এরপর দেওয়া হয় একটি লিংক। সেই লিংকে প্রবেশ করে তথ্য দিলে তা সরাসরি চলে যায় প্রতারকদের কাছে।

ডিজিটাল প্রতারণার নতুন কৌশল

বর্তমানে অনলাইন প্রতারণার ধরন আরও আধুনিক ও জটিল হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকরাও নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছে। আগে যেখানে সাধারণ ফোনকল বা ভুয়া বার্তার মাধ্যমে প্রতারণা করা হতো, এখন সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভুয়া ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

ভুয়া চাকরির অফার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ বা ই-মেইলের মাধ্যমে আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব দিয়ে প্রতারণা করা এখন বেশ সাধারণ হয়ে উঠেছে। প্রতারকরা নামী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখায় এবং আবেদন ফি, প্রশিক্ষণ ফি, নিবন্ধন ফি বা ব্যক্তিগত তথ্য চায়। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক তথ্য কিংবা পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিও চাওয়া হয়। তথ্য দেওয়ার পর ভুক্তভোগী আর কোনো যোগাযোগ পান না, কিংবা তার তথ্য ব্যবহার করে আরও প্রতারণা করা হয়।

অনলাইন কেনাকাটার প্রতারণা

অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম দামে আকর্ষণীয় পণ্য দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করা হয়। অনেক সময় জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে ভুয়া পেজ তৈরি করা হয়। ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর পণ্য পাঠানো হয় না, আবার কখনো নিম্নমানের বা ভিন্ন পণ্য পাঠানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে পেমেন্টের নামে ভুয়া লিংকে নিয়ে গিয়ে ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি করা হয়।

পুরস্কার বা লটারির ফাঁদ

‘আপনি বড় অঙ্কের পুরস্কার জিতেছেন’, ‘বিদেশ থেকে উপহার এসেছে’ বা ‘লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন’—এ ধরনের বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণা করা হয়। পুরস্কার পাওয়ার আগে কর, প্রসেসিং ফি বা ডেলিভারি চার্জের নামে টাকা দাবি করা হয়। আবার অনেক সময় পুরস্কার দেওয়ার অজুহাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কার্ডের তথ্য বা ওটিপি চাওয়া হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে মুহূর্তেই অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে প্রতারকরা।

ভুয়া কাস্টমার কেয়ার

ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে ফোন করে প্রতারণা করা হয়। গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে সমস্যা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য তথ্য হালনাগাদ করতে হবে বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ভয় দেখিয়ে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা কার্ডের তথ্য চাওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠান কখনো ফোন করে এসব গোপন তথ্য চায় না।

ডিপফেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। পরিচিত ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যের কণ্ঠ নকল করে জরুরি অর্থ চাওয়া, ভুয়া ভিডিও তৈরি করে বিভ্রান্ত করা কিংবা কারও পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে এসব প্রতারণা আরও নিখুঁত হয়ে উঠছে, তাই কোনো অস্বাভাবিক বার্তা, ভিডিও বা ফোনকল পাওয়ার পর সরাসরি বিশ্বাস না করে যাচাই করা জরুরি।

যে কারণে মানুষ প্রতারণার শিকার হয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতারকরা মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ, ভয়, লোভ কিংবা কৌতূহল তৈরি করে তারা ব্যবহারকারীকে ভুল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

যেমন—‘এখনই অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘আজকের মধ্যেই অফার শেষ’, ‘আপনি বড় পুরস্কার পেয়েছেন’—এ ধরনের বার্তা মানুষকে যাচাই না করেই ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করে।

প্রতারণা থেকে বাঁচতে যা করবেন

  • অপরিচিত কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক থাকুন।
  • ফোন, এসএমএস বা ই-মেইলে কখনোই পাসওয়ার্ড, ওটিপি, পিন বা ব্যাংক তথ্য শেয়ার করবেন না।
  • কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচয় দিলেও সরাসরি বিশ্বাস না করে তাদের অফিসিয়াল নম্বর বা ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করুন।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন।
  • সব অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
  • সম্ভব হলে দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা (টু ফ্যাক্টর) চালু করুন।
  • সন্দেহজনক অ্যাপ বা সফটওয়্যার ইনস্টল করবেন না।
  • অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক অফার বা অতিরিক্ত লাভের প্রতিশ্রুতি থেকে সতর্ক থাকুন।

প্রতারণার শিকার হলে যা করবেন

যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেনদেন বন্ধের চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটে অভিযোগ করতে হবে।

সতর্ক থাকুন: কোনো লিংক, বার্তা বা ফোনকলের কারণে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। যাচাই করুন, তারপর পদক্ষেপ নিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত