নৈতিক স্খলনে এমপি পদ হারানোর ঝুঁকিতে জামায়াত নেতা

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম সেটিকে তার ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ বলে দাবি করেছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ দাবি আইনি বৈধতার শর্ত পূরণ করে না। ফলে তার সংসদ সদস্য পদসহ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন, বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে ঝুঁকি রয়েছে সংসদ সদস্য পদও হারানোর।

হোটেলে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গাজী নজরুল প্রথমে নীরব থাকলেও পরে ফেসবুকে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। পরে তার প্রথম স্ত্রী, ওই তরুণী এবং তরুণীর বাবাও বিয়ের দাবি সমর্থন করেন।

এর আগে জামায়াত-সমর্থকদের একটি অংশ ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছিল। পরে গাজী নজরুল জানান, গত ১৭ জুন তিনি ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।

ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে গাজী নজরুলকে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বলেন, ঘরটি অন্য একজন ভাড়া করেছিলেন এবং তিনি ওই তরুণীকে নিয়ে সেখানে মাত্র একবার গিয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন।’

দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আইনি অবস্থান
‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী, বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে সংশ্লিষ্ট সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি নিতে হয়। এ অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা আইনি জটিলতার সৃষ্টি করে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ নয়; তবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে তা ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’-এর আলোকে নিবন্ধনের যোগ্য থাকে না।

গাজী নজরুল দাবি করেছেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামে তরুণীর বাবার বাড়িতে তাদের বিয়ে হয়েছে। তবে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য এমপির পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি।

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল আজিজ বলেন, বিয়ের বিষয়ে তিনি পরে জেনেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথম স্ত্রী ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান তিনি।

কাবিননামা নিয়েও প্রশ্ন
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কথিত কাবিননামায় কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহর সিল রয়েছে। তিনি বলেন, তিনি বিয়ে পড়াননি, শুধু নিবন্ধন করেছেন।

সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া নিবন্ধন কেন করা হলো-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলেই তিনি নিবন্ধন করেন।

তবে আইনজীবীরা বলছেন, প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতি বা সম্মতি কোনোভাবেই সালিসি পরিষদের অনুমতির বিকল্প হতে পারে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য আইনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। গাজী নজরুলের নির্বাচনী হলফনামায় তার সন্তানের তথ্য রয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।

জিম্মি করার অভিযোগ, থানায় মামলা নয়
গাজী নজরুল অভিযোগ করেছেন, ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাকে ও তার দুই স্ত্রীকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়।

তবে হাতিরঝিল ও রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি।

অন্যদিকে, কয়েক সপ্তাহ আগে তার ভাইয়ের গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে পল্লবী থানার ওসি জানিয়েছেন।

জীবনবৃত্তান্তে অসংগতি
ঘটনাটিকে ঘিরে আরও কিছু অসংগতি সামনে এসেছে। তরুণীর জীবনবৃত্তান্তে ২২ জুন ২০২৬ তারিখে গাজী নজরুলের সুপারিশ থাকলেও সেখানে তার বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া সুপারিশপত্রে গাজী নজরুলের স্বাক্ষর এবং কথিত কাবিননামায় থাকা স্বাক্ষরের মধ্যে অমিল রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

উঠছে নৈতিক প্রশ্নও 
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিয়ে ব্যক্তিগত বিষয় হলেও আইনি বাধ্যবাধকতা মানতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব আরও বেশি।

তার ভাষায়, আইন লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত