ঢাকা স্টেডিয়ামের ৭৪৬ দোকান থেকে ১০০ কোটি টাকা লোপাট

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) অধীন দোকানগুলো থেকে বছরে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি ‘প্রভাবশালী মহল’। এদিকে বিভিন্ন স্টেডিয়ামের পরিত্যক্ত মালামাল বিক্রিকে কেন্দ্র করে অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে এনএসসির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এনএসসির বিভিন্ন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়, যার যথাযথ হিসাব হয় না। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টেডিয়াম থেকে প্রাপ্ত ভাঙাড়ির বিক্রির মূল্য মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দেখানো হয় ক্রীড়া পরিষদে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এনএসসির অধীন ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে ৭৪৭টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ২৯৬টি, মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে ১৫৩টি, সুপার মার্কেটে ২০৮টি, ব্রজেন দাস সুইমিং পুলে ৫৭টি এবং কাবাডি ও ভলিবল স্টেডিয়ামে ৩৩টি দোকান রয়েছে। জাতীয় স্টেডিয়মের দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্কয়ার ফিট ২৬.৬৮ টাকায়। তিন হাত বদলে এখন ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫০ টাকা করে। সেই হিসাবে আনুমানিক ৫০০ স্কয়ার ফিট একটি দোকানেই সরকার হারাচ্ছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৬০ টাকা। এ হিসাবে গড়ে ৭৪৬টি দোকান থেকে প্রায় শত কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে এনএসসি।

এ ছাড়া জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে অনেকগুলো ভাসমান দোকান আছে, যার অধিকাংশের অনুমোদন নেই। এসব দোকান থেকেও মাসে কয়েক লাখ টাকা আদায় হয়, যা এনএসসি পায় না। অবশ্য মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে সরকারি হিসাবে স্কয়ার ফিট ধরা হয়েছে ২৯.৬৫ টাকা করে। যদিও সেখানে ৩০০ টাকা স্কয়ার ফিট হিসাবে ভাড়া চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দোকান বরাদ্দ ও নবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রভাব কাজ করে। সরকারি হিসাব একটা, অথচ আমাদের দিতে হচ্ছে তার কয়েকগুণ। কোনো কিছুই নিয়ম অনুযায়ী হচ্ছে না।’

ঢাকা স্টেডিয়াম

এদিকে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দোকান রয়েছে ৯০টি। এখানকার সরকারি ভাড়া ২০ টাকা প্রতি স্কয়ার ফিট। আর শেরেবাংলার আউট স্টেডিয়ামে ২৮টি দোকানের স্কয়ার ফিট ভাড়া পাচ্ছে সরকার ২৮ টাকা হারে। যদিও কয়েক হাত বদলে ভাড়া এখন প্রায় ২০০ টাকা করে। কমলাপুর স্টেডিয়ামে ২১৬টি দোকানও এমন হাতবদলে ভাড়া অনেক হয়েছে।

এ বিষয়ে এনএসসির মুখপাত্র এবং পরিচালক (ক্রীড়া-উপসচিব) আমিনুল এহসান বলেন, ‘স্টেডিয়ামের দোকানগুলোয় শায়েস্তা খান আমলের ভাড়া চলছে। ভাড়া আরও বাড়ানো উচিত ছিল। যদিও এটা সরকারের বিষয়। শেষ কবে স্টেডিয়ামগুলোর দোকান ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল, তা জানা নেই। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের নৈরাজ্য থামাতে দোকানগুলোর সরকারি ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।’ হাতবদলে চড়ামূল্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যা চুক্তি রয়েছে, তাই পাচ্ছি। বাইরে কে কি করছে, তা জানি না। কেউ আমাদের বলেও না।’

২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম ও মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এই দুই স্টেডিয়ামের দোকান ভাড়া নিয়ে তিনি বলেন, এসব দোকান বারবার হাতবদল হতে দেখা যায়। এখান থেকে সরকার পায় ৭ থেকে ৮ হাজার, কিন্তু প্রকৃত ভাড়া ২ লাখের কাছাকাছি। এ বিষয়ে তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলেছিলেন।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামের দোকানগুলোর ভাড়া সরকারি নথিতে প্রতি বর্গফুট ২৬ টাকা থাকলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ২১৭ টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার সিংহভাগই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।

শুধু ঢাকাতেই নয়, সিলেট জেলা স্টেডিয়ামেও একই দশা। এপ্রিলে সিলেট জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে দোকান বরাদ্দে দুর্নীতি পান প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তখন ব্যবসায়ীরা তাকে জানায়, প্রতিটি দোকানের জন্য মাসিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেন তারা। তবে জেলা স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়েও তদন্তের কথা বলেছেন।

পেনাল্টি না দিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি

সূত্রে জানা গেছে, কোনো মালিক দোকান বিক্রি করতে হলে এনএসসিকে ৭২ মাসের ভাড়া পেনাল্টি দিতে হয়। তাই অনেকেই দোকান বিক্রির ক্ষেত্রে আগের মালিককেই মালিক দেখিয়ে নতুন মালিক পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেন। এ বিষয়ে আমিনুল এহসান বলেন, ‘কে কী করছে, তা আমাদের জানা নেই। আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি।’ এ বিষয়ে স্টেডিয়ামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এত কম রেটে সরকার দোকান দিয়েছে, অথচ আমরা ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি টাকা ভাড়া দিচ্ছি। ব্যবসা খারাপ হলেও আমাদের ভাড়া কম দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ তারা প্রভাবশালী।’ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের এক ব্যবসায়ী আফসোস করে বলেন, ‘এত কম টাকা পায় সরকার, অথচ আমাদের বেচাকেনা না থাকলেও ১০ গুণ ভাড়া দিতে হয় মালিককে। এদিকে নজর দেওয় উচিত এনএসসির।

দিনে লাখ টাকা চাঁদা আদায়

ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের ভেতরে, মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের বাইরে ভাসমান দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। স্টেডিয়ামের ক্ষমতাসীন দলের কর্মচারীরাই এই চাঁদা আদায় করে ভাগ-বাটোয়ারা করেন। কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢাকার বাইরের গাড়ি পার্কিং থেকেও জাতীয় স্টেডিয়াম ও হকি স্টেডিয়ামের কর্মচারীরা প্রতিদিন অর্ধ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন পল্টন শ্রমিক দলের সভাপতি ইদ্রিস। তিনি চাঁদা তোলেন সিদ্দিক, ইসা ও আরও কয়েকজনের মাধ্যমে। প্রতিদিন বিকেল ৫টা বাজলেই চাঁদা তোলা শুরু হয়। এ বিষয়ে এনএসসির পরিচালক আমিনুল এহসান বলেন, ‘চাঁদার বিষয়ে পল্টন থানা পুলিশে অভিযোগ করেছি। তারা সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবে।’ এদিকে স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপ মুখোমুখি। একটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ করছেন ইদ্রিস।

কর্মচারীদের টেন্ডারবাজি

রাজনৈতিক পরিচয়ে টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত হন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কর্মচারীরাও। আওয়ামী লীগের সময়ে কর্মচারী ইউনিয়ন লীগের সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামসহ দেশের বিভিন্ন স্টেডিয়ামের টেন্ডার বাগিয়ে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। শুধু খলিলই নন, জাতীয় স্টেডিয়ামের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন লীগের সেলিমসহ অন্যরাও এতে জড়িত ছিলেন। ক্রীড়া পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানদের ব্যক্তিগত সহকারী রশিদুজ্জামান সেরনিয়াবাতের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির ভাগ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া জাতীয় স্টেডিয়ামের তিনটি গেটের ইজারাদারও রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয়-স্বজনরা বলেও জানা গেছে। স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের ভেতরে বাথরুম, পানি ও ভাতের হোটেলগুলোও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের দখলে।

দোকান ভাড়া বাকি ৯ কোটি টাকা

জাতীয় স্টেডিয়াম, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম, শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এত কম ভাড়ার পরও তা সময় মতো পরিশোধ করেন না দোকানিরা। এখনো ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা দোকান ভাড়া বাকি রয়েছে।

ভাঙারি বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন

বিভিন্ন স্টেডিয়ামে সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের সময় প্রায় অর্ধকোটি টাকার পরিত্যক্ত মালামাল বিক্রি হয়, যার এক-তৃতীয়াংশ দেখানো হয় সরকারি খাতায়। বাকিটা কর্মকর্তাদের পকেটস্থ হয়। সম্প্রতি সেরকম একটি অভিযোগ উঠেছে এনএসসির সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) সাজিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ লিপিবদ্ধভাবে ক্রীড়া পরিষদে দিয়েছেন কর্মচারী মিজান। শুধু তাই নয়, বগুড়ার নাম ভাঙ্গিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে দাপট দেখানোর অভিযোগও আছে সাজিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগকে চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অভিযুক্ত সাজিয়া আফরিন। তার কথা, ‘এনএসসির নির্বাহী পরিচালকের (ইডি) আদেশে চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত চার-পাঁচজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে অন্যত্র বদিল করায় তারা এসব রটাচ্ছে।’

তবে একজন সাবেক ক্রীড়া প্রশাসক বলেন, ‘সরকারি সম্পদ বিক্রিতে উন্মুক্ত দরপত্র, স্বাধীন মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা নিশ্চিত না হলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।’ এনএসসির পরিচালক আমিনুল এহসান বলেন, ‘এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।’

মাদকের হাট

মাদক কারবারিদের অন্যতম স্পট হয়ে উঠেছে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মাদক কেনাবেচা। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেডিয়ামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে লাখ লাখ টাকার গাজা বিক্রি হয় এখানে। গাজার গন্ধে স্টেডিয়ামে চলাচল করা দায় হয়ে পড়ে।’ কিন্তু এদিকে কোনো নজর নেই ক্রীড়া পরিষদের। এনএসসির পরিচালক আমিনুল এহসানের কথা, ‘ভাসমান নিশিযাপনকারীদের তাড়ানোর অনেকবার চেষ্টা করেছি, সফলও হয়েছিলাম। কিন্তু পরে আবার ফিরে আসে।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি

সুশাসনকর্মীদের মতে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আয়-ব্যয়ের ওপর নিয়মিত নিরীক্ষা হলেও সেই প্রতিবেদনগুলো জনসম্মুখে সহজলভ্য নয়। ফলে সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমের পক্ষে প্রকৃত আর্থিক চিত্র যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা মনে করেন, দোকান ভাড়া, স্টেডিয়াম ব্যবহার ফি, বিজ্ঞাপন, ইভেন্ট আয়োজন ও ভাঙারি বিক্রিসহ সব ধরনের আয়-ব্যয়ের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে।

তদন্তের দাবি

ক্রীড়া সংগঠক, ব্যবসায়ী ও সুশাসন কর্মীদের একটি অংশ মনে করে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনিয়মের অভিযোগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত