রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে স্বার্থবিরোধী নীতিমালা করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ায় বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রাষ্ট্রীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও) টেলিটক বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিলুপ্ত বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি বা টিঅ্যান্ডটি) অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের টেলিটকে পুনর্বাসন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য এবং দক্ষ জনবলের অভাব, যথাসময়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় প্রতিযোগিতার সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি রাষ্ট্রীয় এ কোম্পানির। অপার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখেনি। প্রতি বছরই গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান।
অডিট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই টেলিটক ১৫৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। কোম্পানিটির এ যাবতকালের নিট পুঞ্জীভূত লোকসান (অ্যাকুমুলেটেড লস) দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭৪ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ১৯৫ টাকায়। অর্থাৎ তাদের মোট সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণ বেড়েছে ৭০৩ কোটি ৩৪ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, সম্পদ ও দায়ের অনুপাত ১০০ : ১৫৮। ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ধরনের দায় উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকি বহন করে। অডিট রিপোর্ট বলছে, সরকারের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকে ১১৩ কোটি টাকার অপরিশোধিত ঋণ রয়েছে টেলিটকের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিটকের আয় বাড়লেও পরিচালন ব্যয় কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বেসরকারি খাতের মতো করপোরেট কাঠামোতে উচ্চ বেতন, গ্র্যাচুইটি সুবিধা, আউটসোর্সে জনবল নিয়োগে অত্যধিক ব্যয়, এন্টারটেইনমেন্ট, পরিবহনসহ অন্য অনেক খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বছর শেষে টেলিটকের লোকসানের খাতা ভারী করছে। শুধু সিকিউরিটি গার্ড ও ক্লিনার হায়ার বাবদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ১১ কোটি ১০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। ছোট এ প্রতিষ্ঠানটি পরপর দুই অর্থবছরে এন্টারটেইনমেন্ট খাতে ব্যয় করেছে ৫৮ ও ৫০ লাখ টাকা।
টেলিটকের ডিরেক্টরস রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত অর্থবছরে ৬১৯ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে পরিচালন আয় ছিল ৫৪৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে আয় ছিল ৫২৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৫৮৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। তার পূর্ববর্তী অর্থবছরে ৪৯৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। প্রযুক্তিনির্ভর সংস্থাটির অবচয় ব্যয়সহ কর পরিশোধ পরবর্তী লোকসান ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২৪৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৯৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি টাকা।
জন্মলগ্ন থেকেই সমস্যার শুরু : ২০০২ সালে তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে টেলিটক কোম্পানিকে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক। পরের বছর রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) নিবন্ধনের পর বিলুপ্ত টিঅ্যান্ডটির ৬৮৩ কোটি টাকার পুরনো প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও দায়কে সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে টেলিটকের ঘাড়ে চাপানো হয়। একই সঙ্গে টিঅ্যান্ডটির বেশ কিছু জনবলও টেলিটকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এমএনও ব্যবসায় একটেল এবং গ্রামীণফোনের আধুনিক প্রযুক্তির বিপরীতে টেলিটকে তখন পুরনো যন্ত্রপাতি ও মান্ধাতা আমলের জনবল নিয়ে কাজ শুরু করে।
এরপর ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও টেলিটক নামমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচালিত হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে দেশে এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স রেগুলেটরি অথরিটি (বিটিআরসি)। এ সময় দেশ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক টেলিযোগাযোগের যুগে প্রবেশ করে। এ সময় বিটিআরসির তৈরি করা বিভিন্ন নীতিমালা টেলিটককে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এর একটি ছিল ইন্টারন্যাশনাল লং ডিসট্যান্স টেলিকমিউনিকেশনস সার্ভিস (আইএলডিটিএস) ২০১০। এ নীতিমালার আওতায় ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশনস ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) প্রতিষ্ঠা করে বিটিআরসি ব্যান্ডউইডথ বিক্রিতে মধ্যস্বত্বভোগী সৃষ্টি করে সামিট ও ফাইবার অ্যাট হোম নামক দুটি কোম্পানিকে কাজ দেয়। এতে করে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি টেলিটককে মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দরে ব্যান্ডউইডথ কিনে ব্যবসা করতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি কিছু সুবিধা পেলেও স্বল্প বিনিয়োগ, দুর্বল প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক নিয়ে ব্যবসায় কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি টেলিটক। বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা কোম্পানিটিকে আরও বিপদে ফেলেছে। ২০১৮ সালে টাওয়ার শেয়ারিং গাইডলাইন নামক একটি নীতমালার অধীনে এমএনওগুলোকে নেটওয়ার্ক টাওয়ার ভাড়ায় নিয়ে গ্রাহকসেবা দিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে টেলিটকসহ অন্য এমএনও যেমন রবি, বাংলা লিংক এবং এয়ারটেলের ব্যয় বেড়ে যায়। জিপির আগে থেকেই সারা দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিজস্ব টাওয়ার থাকায় তারা প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যায়।
এ ছাড়া বিটিআরসি ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) নীতিমালা করে তাদের মাধ্যমে পাড়া-মহল্লাসহ তৃণমূল পর্যায়ে ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করতে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতি কলে আইসিএক্স ১০ পয়সা করে নিতে শুরু করে। তবে আয় কমে যায় এমএনওদের। টেলিটক সেই সময় বিটিআরসির কাছে বাল্ক ব্যান্ডউইডথ বিক্রির অনুমোদন চেয়েও পায়নি। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি, ব্যান্ডউইডথ কেনা বাবদ কোনো অর্থ পরিশোধ করতে না হলেও এ দেশে টেলিটককে সব দায় বহন করতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত রাজনৈতিক সম্পর্কের সুবিধা দিতেই তখনকার সরকার বিটিআরসির মাধ্যমে বিভিন্ন নীতিমালা করে, যা ছিল টেলিটকের স্বার্থবিরোধী।
সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি : সারা দেশে নেটওয়ার্ক সক্ষমতা অনুযায়ী টেলিটক মাত্র ৬৮ লাখ ২০ হাজার সক্রিয় সিম ব্যবহারকারীকে সেবা দিচ্ছে। এ সেবার আর্থিক মূল্য অন্য অপারেটরদের তুলনায় অনেক কম। মহানগর ও নগরকেন্দ্রিক এ সেবার মূল্য মিনিটপ্রতি মাত্র ৪৫ পয়সা। এর সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স যোগ হলে মিনিটপ্রতি ফোনকলে গ্রাহকের কথা বলার খরচ দাঁড়ায় ৭০ পয়সার মতো। এটিই বিটিআরসির ফ্লোর প্রাইস। অথচ জিপি ও রবিতে প্রতি মিনিটে খরচ যথাক্রমে ২ টাকা ও ১ টাকা ৯৯ পয়সা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ৫৭ শতাংশ কর ও মূসক। ফলে গ্রাহকের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় মিনিটপ্রতি ৩ টাকারও বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু স্বল্প ট্যারিফের কারণেই টেলিটকের ব্যবসা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে সর্বত্র নেটওয়ার্ক সুবিধা দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বাড়ছে না। নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে রাষ্ট্রীয় এ এমএনওর দরকার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে স্বল্প ব্যয়ে কথা বলার সুবিধা পেতে গ্রাহক সংখ্যা বাড়বে। এতে করে অন্য মোবাইল অপারেটরদের একতরফা আধিপত্য খর্ব হয়ে প্রতিযোগিতার বাজারও সৃষ্টি হবে।
সার্বিক বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী ফোন ধরে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ামাত্র কল কেটে দেন। পরে প্রধান কার্যালয়ের কোম্পানি সচিবের দপ্তর থেকে জানানো হয়, গত অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। তিন ধরনের সেবায় আয় আগের বছরগুলোর তুলনায় আশাব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাহকসেবার মান ও পরিধি বাড়াতে বর্তমানে তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে গ্রাহকদের উন্নত নেটওয়ার্ক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে আয় আরও বাড়বে এবং খুব দ্রুত টেলিটক আয়-ব্যয়ের সমতায় ফিরে আসবে।
