ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনের দাবানল আরও ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপের এই দুই দেশ যখন দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দাবানল পরিস্থিতির আরও অবনতির বিষয়ে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের এক কর্মকর্তা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংকট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার হাদজা লাহবিব জানিয়েছেন, চলতি বছর এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ইউরোপে দাবানলের মৌসুম আগামী শীতের আগমনের সময় নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পাশাপাশি এবার দাবানলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানল তাণ্ডবে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দোর ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে দাবানল। শহরের মেয়র বলেছেন, তিনি সব ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মেয়র থমাস কাজেনাভে বলেন, ‘আমরা বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। সেই সঙ্গে আগেই আরও লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ জিরোন্দে অঞ্চলে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তিনি বলেন, দেশ নজিরবিহীন দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। জিরোন্দে তৈরি হওয়া ‘মেগা দাবানল’ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতে ইইউ কর্মকর্তাদেরও সেখানে পাঠানো হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাহী বিভাগ দাবানল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্লকের জরুরি সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় উপদ্রুত দেশগুলোতে সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়টি সমন্বয় করেছে। ফ্রান্সে ৭টি বিমান ও ৪টি হেলিকপ্টার এবং স্পেনে ৬টি বিমান ও ৩টি বিশেষ দমকলকর্মী দল পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই দাবানলে ফ্রান্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত এই আগুনে ইতিমধ্যে প্যারিস শহরের চার গুণ বড় এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানলের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব দাবানলে দেশটির ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর পরিমাণ জমির গাছপালা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এর আগে ২০২২ সালের দাবানলে ফ্রান্সের ৭২ হাজার একর জমির গাছপালা পুড়ে গিয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত সেটিই ছিল দাবানলে ফ্রান্সে সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতির রেকর্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা এই দাবানলের অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন ছড়ানোর গতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফ্রান্সের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সতর্ক করে বলা হয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার থেকে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা বেড়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। আগামী তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস এই বিশাল আগুন মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্ডি বলেন, ‘আগুন কীভাবে ছড়াবে তা আমরা নিশ্চিত নই, কারণ এর সামনের অংশ প্রতিনিয়ত দিক পরিবর্তন করছে। আমরা সরাসরি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছি না’।
এদিকে, স্পেনের পরিস্থিতিও দিন দিন অবনতি হচ্ছে। দক্ষিণ স্পেনে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে। সেখানে বাতাস ও তীব্র শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে প্রতি ঘণ্টায় ৬ কিলোমিটার বেগে আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০০ মিটার গতিতে এগোনো আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। তবে স্পেনের এই আগুন উদ্ধারকারীদের স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে ২০ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ানোর কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ার কাছে গত রবিবার একটি নতুন দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আগুন নেভাতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শহরটি থেকে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। গত সোমবার ভ্যালেন্সিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনে করেন স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা।
ফ্রান্সে ১৬২ জন গ্রেপ্তার : অসচেতনতা, অসতর্কতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল উসকে দেওয়ার অভিযোগে ফ্রান্সে ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকোর্নু বলেছেন- যারা দাবানল উসকে দিচ্ছে, তাদের শনাক্ত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ফ্রান্সে প্রতি ১০ দাবানলের ৯টিই ঘটছে মানবসৃষ্ট কারণে।
