ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে গত এক বছরে দুর্বৃত্তদের হাতে ৭টি গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ ও নারী। এ সব খুনের সঙ্গে কারা জড়িত তার একটিও এখনো শনাক্ত হয়নি। বিচার প্রক্রিয়া দূরের কথা এখন পর্যন্ত এ সাত খুনের একটিরও তদন্ত শেষ হয়নি। এ নিয়ে হতাশার মধ্যে আছেন স্বজনেরা। এ সাত খুনের মধ্যে ছয়টি হত্যার তদন্ত করছে সরাইল থানার পুলিশ। আর চাঞ্চল্যকর শিশু ময়না হত্যার তদন্ত করছে পিবিআই।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৬ জুলাই সরাইল থানার পুলিশ পঞ্চশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইমুনা আক্তার ময়নার (১০) রক্তাক্ত লাশ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামের একটি মসজিদের দ্বিতীয় তলা থেকে উদ্ধার করে। শিশুটি শাহবাজপুর ছন্দু মিয়া পাড়ার প্রবাসী আবদুর রাজ্জাক মিয়ার দ্বিতীয় কন্যা।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
মাইমুনা আক্তার ময়নাকে ধর্ষণের পর হত্যার সঙ্গে জড়িতদের এক বছর পরও চিহ্নিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নানাভাবে হেনস্তা ও নির্যাতনের শিকার ময়নার মা-বাবা মেয়ে হত্যার বিচারের আশায় দিন গুণছেন। প্রথম তিন মাস মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন সরাইল থানার পুলিশ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শিশুটির বাবা আবদুর রাজ্জাক বর্তমানে সৌদি প্রবাসী। তিনি মুঠোফোনে বলেন, আমরা এখনো নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি। আমরা যাদেরকে সন্দেহ করি পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা হতাশার মধ্যে আছি।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের পরিদর্শক বেলাল উদ্দিন বলেন, শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ৪০ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনের ফলাফল পাওয়া গেছে। এদের কারও সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।
এ ছাড়া গত ১০ জুলাই সন্ধ্যার পর দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হয় সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া গ্রামের কিশোর জিহাদ মিয়া (১৫)। সে কুট্টাপাড়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এখনো শনাক্ত হয়নি জিহাদের হত্যাকারী কে।
গত ১০ জুন রাতে পানিশ্বর ইউনিয়নের বেড়বলা গ্রামের প্রবাসীর স্ত্রী কুলসুম আক্তারের (২৮) লাশ নিজ গৃহ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওই গৃহবধুর গলা, কানের নিচে ও বুকের আঘাতেন চিহ্ন পায় পুলিশ। তাকে খুন করে লুট করা হয় নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মুঠোফোনসেট। এ ঘটনায় মামলা হলেও শনাক্ত হয়নি কুলসুমের হত্যাকারী কারা।
দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২৫ জুন উপজেলার শাহজাদাপুর ইউনিয়নের দেওড়া গ্রামের বৃদ্ধ আবু সাইদের (৬০) লাশ পাওয়া যায় গ্রামের একটি খালে। দুর্বৃত্তরা তাকে গলা কেটে হত্যা করে। এ ঘটনায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর গ্রামে দুই বংশের সংঘর্ষে নিহত (আরফজ আলী-৬০) পক্ষের লোকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হলেও এখনও শনাক্ত হয়নি বৃদ্ধ আবু সাইদের খুনি কারা।
গত ১৮ মে উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের দুবাজাইল এলাকা থেকে পুলিশ আবেদ আলী (১৭) নামের এক তরুণের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে। আবেদ আলী উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের কালিশিমুল গ্রামের মৃত মতি মিয়ার ছেলে। আবেদ আলী হলুদ-মরিচ ভাঙ্গার দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করত। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তার হত্যাকারী কে এখনো জানা যায়নি।
গত ২৩ মার্চ কালীকচ্ছ ইউনিয়নের মনিরবাগে নূর আহমেদ (৭৩) নামের এক নৈশপ্রহরীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখনো শনাক্ত হয়নি নূর আহমদের খুনি কারা।
গত বছরের ৩০ জুলাই ব্যাবসায়ী মোস্তফা কামালকে (৫৫) কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া এলাকায় গ্রামীণ সড়কে কুপিয়ে হত্যা করে নগদ টাকা লুটে নেয়। এ ঘটনায় মামলা হয় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে। পুলিশের ভাষ্যমতে মোস্তফা কামাল হত্যার সঙ্গে জড়িত শনাক্ত হলেও এখনো মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, এসব হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মাদকাশক্ত এবং নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এ সব ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের কাছ থেকে কথা বের করা বেশ কঠিন। আইনি বাধার কারণে আমারা এদের বেশি কিছু করতেও পারি না। এরপর ও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
