সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়ির পেছনের গ্লাস ভেঙে গেছে। হামলার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন এনসিপির স্থানীয় নেতারা।
বৃহস্পতিবার গোলাপগঞ্জ পৌর অডিটোরিয়ামে জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় শেষে বের হয়ে যাওয়ার পথে চৌমুহনী এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। গোলাপগঞ্জ থানার ওসি মো. ছবেদ আলী জানান, এনসিপির নেতাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল নিক্ষেপ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।
এনসিপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সদস্য শিব্বির আহমদ বলেন, ‘এনসিপির সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতু ও আতিকুর রহমান মোজাহিদের গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাত শহীদ পরিবারের সদস্যদের বহনকারী গাড়িও আক্রান্ত হয়েছে।’
ঘটনার পর এনসিপি নেতা সারজিস আলম ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সিলেটের গোলাপগঞ্জে আবার আমাদের গাড়িতে রক্তাক্ত হামলা করেছে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। গাড়ি ভাঙচুর করেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, এনসিপি নেতারা মতবিনিময় সভা শেষে বের হওয়ার সময় একদল লোক তাদের উদ্দেশে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে। স্থানীয় চৌমুহনী এলাকায় এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর পৌঁছালে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় একটি অটোরিকশাও ভাঙচুর করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
গোলাপগঞ্জ থানার ওসি ছবেদ আলী বলেন, অনুষ্ঠান শেষ করে বের হয়ে যাওয়ার সময় সারজিস আলমের গাড়িতে দূর থেকে ইট ছুড়লে গ্লাস ভেঙে যায়। তারা অনুষ্ঠান শেষে সিলেটের দিকে যাচ্ছিলেন।
প্রথম পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সারজিস আলম আবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দ্বিতীয় দফায় বিএনপির সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর আবার হামলা করেছে সিলেটের পাঁচ মাইল বাজারে। তারেক রহমান কি শেখ হাসিনা হতে চায়?’
হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী হামলা চালায়নি। এনসিপি নেতারা বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে কোনো কথা বললেও বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া ছিল। এনসিপি নেতারা জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন, কিন্তু আহতদের কারও সঙ্গে দেখা করেননি। এটা থেকেই ঝামেলা হয়েছে বলে শুনেছি।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ডা. মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা গাড়িবহর নিয়ে কানাইঘাটের পথে যাত্রা করেন। এনসিপির পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী বিকেলে কানাইঘাটে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি ও সমাবেশে অংশ নেন তারা।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতেও হামলার ঘটনা ঘটে। পরদিন মৌলভীবাজারে পুলিশের বাধার পর এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সিলেটে পৌঁছান।
সরকারের সন্ত্রাসী চরিত্র জাতির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে : নাহিদ ইসলাম
সন্ত্রাস মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হবিগঞ্জ ও সিলেটের গোলাপগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহর ও নেতাদের ওপর হামলা হয়েছে। বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ— আমরা যা দেখছি, দেশকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যের দিকে আবারও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সরকারের সন্ত্রাসী চরিত্র আবারও জাতির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। সরকার সন্ত্রাসের পথে হাঁটলে, জনগণ প্রতিরোধের পথে হাঁটবে।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনি অডিটোরিয়ামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মরণে ‘অগ্নিঝরা জুলাই: রক্তের ঋণ ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের কিছু আগে গোলাপগঞ্জে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা গোলাপগঞ্জ যাব, আমরা দাঁড়াব। দেখি, কত সন্ত্রাসী আছে এই সরকারের। আমরা বিচার ও সংস্কারের দাবি থেকে এক চুলও সরে যাব না। আমাদের কর্মসূচি চলমান থাকবে।’
এ সময় দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘এনসিপি সংঘাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। যারা সংঘাত করতে চায়, তাদের পরিণতি ভালো হবে না।’
তারেক রহমানের সিগন্যাল ছাড়া হামলা হতে পারে না : সারজিস আলম
তারেক রহমানের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া হামলা হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। সিলেটের গোলাপগঞ্জে হামলার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে ভাঙচুর করা গাড়িটি সাংবাদিকদের দেখিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘উপরে উপরে ভালো হওয়ার ভান ধরে, ভেতরে ভেতরে ছাত্রলীগ যেভাবে বেপরোয়া ছিল, সন্ত্রাসী বাহিনী ছিল, একইভাবে ছাত্রদলকে তারেক রহমান পরিচালনা করছেন। তারেক রহমানের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া, স্থানীয় বিএনপির গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া বিএনপি, যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা গোলাপগঞ্জের কর্মসূচি শেষ করে পাঁচ মাইল বাজারে দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলাম। সেখানে সন্ত্রাসীরা রড ও চাপাতি নিয়ে এসেছিল। বিএনপির ওই সন্ত্রাসীরা রড ও চাপাতি দিয়ে আমাদের গাড়িতে হামলা করেছে।’
ছাত্রদল এখন চোখপিপাসু উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ছিল রক্তপিপাসু, আর তারেক রহমানের ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা হয়েছে চোখপিপাসু। আমাদের একজনের চোখ হবিগঞ্জে তুলে নিয়েছে। আরেকজনের চোখ তুলে নেওয়ার জন্য এখানে চোখে আঘাত করেছে। আমরা খেতে গিয়েছিলাম, সেখানেও আমাদের নামতে দেয়নি। তাদের কথা হলো, বাংলাদেশে আবার শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার কায়েম করবে, আর কোনো দলকে দাঁড়াতে দেবে না। এটা যদি হয়, বিএনপির পরিণতি শেখ হাসিনার চেয়েও ভয়াবহ হবে।’