কিশোরগঞ্জ কর অফিসে কর্মরত অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, করদাতা ও আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মারমুখী আচরণের অভিযোগ তুলে টানা কর্মবিরতি ও কর অফিস বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অন্যত্র বদলির দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তারা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অগ্রিম কর, বকেয়া কর, কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ, আপিল, শুনানিসহ সব ধরনের আয়কর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবীরা।
এদিকে আইনজীবীদের এ কর্মসূচির কারণে কিশোরগঞ্জ কর অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজ নিয়ে কর অফিসে আসা শত শত করদাতা প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন সাধারণ করদাতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরেজমিনে কিশোরগঞ্জ কর অফিসে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথারীতি উপস্থিত থাকলেও আইনজীবীদের অনুপস্থিতির কারণে অধিকাংশ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ, আপত্তি নিষ্পত্তি, অগ্রিম কর ও বকেয়া কর পরিশোধ, আপিল শুনানি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের জন্য আসা করদাতারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কর অফিস সূত্রে জানা গেছে, আইনজীবীদের অংশগ্রহণ ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, গত ৫ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম শহরের কয়েকজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে যান। সেখানে তিনি কর কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন, এমন অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির নেতারা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে তার কার্যালয়ে যান। সেখানে জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, তিনি কর কমিশনারের অনুমতি নিয়েই চিকিৎসকদের চেম্বারে গিয়েছিলেন। তবে উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে জানান, এ ধরনের কর্মকা- একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য শোভন নয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে এ ধরনের যোগাযোগ সরকারি দায়িত্ব পালনের নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কর আইনজীবী সমিতির অভিযোগ, এ সময় জাহাঙ্গীর আলম উত্তেজিত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান, টুপি ও পাঞ্জাবি খুলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিনের দিকে তেড়ে যান। পরে উপস্থিত আইনজীবী ও করদাতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘটনাটি সেখানে উপস্থিতদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
ঘটনার পরপরই কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতি জরুরি সভা করে। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি না করা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ কর অফিস বর্জন এবং সব ধরনের আয়কর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি লিখিতভাবে নরসিংদী কর জোনের কমিশনারকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
আইনজীবীদের কর্মসূচির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ করদাতারা। করদাতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আজ কর রিটার্ন সংক্রান্ত একটি কাজ করতে এসেছিলাম। কিন্তু আইনজীবীরা কর্মসূচিতে থাকায় কাজ করতে পারলাম না। বারবার অফিসে আসতে হচ্ছে, এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
আরেক করদাতা শারমিন আক্তার বলেন, সরকারকে আমরা নিয়মিত কর দিই। কিন্তু অফিসে এসে যদি সেবা না পাই, তাহলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের আচরণগত সমস্যা রয়েছে। তিনি করদাতা ও আইনজীবীদের সঙ্গে প্রায়ই উদ্ধত ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে করদাতারা সন্তোষজনক উত্তর পান না। এমনকি আমাদের সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গেও তিনি অশোভন আচরণ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল, শালীন ও পেশাদার আচরণ প্রত্যাশা করি। কিন্তু তার আচরণে আইনজীবী সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তাই তাকে অন্যত্র বদলি না করা পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে এবং কোনো আইনজীবী আয়কর সংক্রান্ত মামলা বা কার্যক্রমে অংশ নেবেন না।
সালাহউদ্দিন আরও বলেন, এই কর্মসূচির কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হচ্ছে। অগ্রিম কর, বকেয়া কর, কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ, আপিল শুনানিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। আমরা চাই দ্রুত এই কর্মকর্তাকে বদলি করা হোক। নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নিলে আমরা আগের মতো পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করব এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করব। তিনি আরও বলেন, করদাতারাও আমাদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ফলে কর অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতির দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আইনজীবীদের কর্মসূচির কারণে রাজস্ব আদায়ে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বরং কর আদায় বেড়েছে। চিকিৎসকদের চেম্বারে যাওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তদন্তে একজন চিকিৎসক তার আচরণের প্রশংসা করে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই তদন্তে কিছু ব্যক্তি কর-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, বিভাগীয় একাধিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং গত ৮ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত কর আদায়ে প্রায় ১২৫ থেকে ১৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নরসিংদী কর জোনের কর কমিশনার মো. মহিতুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
