এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

ঝড়-বৃষ্টি আর রোদ যাই থাকুক না কেন ছকিনা বেগমের একমাত্র ঠিকানা একটি ঝুপড়ি ঘর। তার এই সংসারে কেউ নয় আপন জনা। সকাল হলেই লাঠিতে ভর দিয়ে ঝুপড়ি ঘর থেকে বের হন ছকিনা বেগম। তার আশা একমুঠো চাল কিংবা একটু খাবার আশপাশের কোনো না কোনো বাড়ি থেকে মিলবে। তবে কেউ তাকে ফিরিয়ে দেন না। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অনেকেই। পেটে দেওয়ার মতো আহার জুটলে তিনি ফিরে আসেন বাঁশঝাড়ের নিচে টিন, বাঁশ ও পলিথিনের জোড়া দেওয়া ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে এটিই তার একমাত্র ঠিকানা।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আদর্শপাড়া এলাকায় অন্যের জমির এক কোণে মানবেতর জীবন কাটছে প্রায় ৭০ বছর বয়সী ছকিনা বেগমের। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর থেকে একাই বয়ে বেড়াচ্ছেন জীবনের সব কষ্ট। সেই দুর্যোগের পর আর কোনোদিন তাদের খুঁজে পাননি। এরপর আর নতুন করে সংসারও গড়া হয়নি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন এই বৃদ্ধা। হৃদরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। কিন্তু চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য নেই তার। স্থানীয়দের দেওয়া সামান্য চাল, খাবার আর সহানুভূতির ওপর ভর করেই টিকে আছে তার জীবন।

ছকিনা বেগম বলেন, ‘স্বামী-সন্তান কেউ নাই। মানুষের কাছে চাইয়া যা পাই, তাই দিয়া কোনোমতে চলি। বৃষ্টি আইলে ঘরে পানি পড়ে, রাতে ঘুমাইতে পারি না। সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া ছিল মাথা গোঁজার একটা ঘর আর বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতা।’

বর্ষা এলেই তার দুর্ভোগ আরও বাড়ে। ঝুপড়ির টিনের চাল চুইয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে পড়ে। চারদিকে কাদা জমে যায়। ঝড়-বৃষ্টির প্রতিটি রাত কাটে আতঙ্কেÑ এই বুঝি শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়ল। অসুস্থ হলেও অর্থাভাবে ওষুধ কেনার সুযোগ হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল মালেক বলেন, ‘ছকিনা বেগমকে বহু বছর এই অবস্থায় দেখে আসছি। এলাকার মানুষ সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন। কিন্তু মানুষের দানে তো জীবনই  চলে না। ঘর তৈরি করবেন কীভাবে? সরকার যদি একটি ঘর করে দেয়, তাহলে অন্তত শেষ বয়সে তিনি নিরাপদে থাকতে পারবেন।’

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, আশ্রয়হীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘যার কেউ নেই, রাষ্ট্র তার পাশে থাকবেÑ এটাই সরকারের অঙ্গীকার।’

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ছকিনা বেগমের চাওয়া খুব বেশি নয়। একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ আর দুবেলা সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের সামান্য মানবিক উদ্যোগই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে তার মুখের হারিয়ে যাওয়া হাসি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত