বন্ধ কারখানায় বিনিয়োগে ১৫ গ্রুপের ৮০ প্রস্তাব

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৪ এএম

সরকারের বন্ধ ও লোকসানি কারখানাগুলো বেসরকারিকরণের উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। বেসরকারি খাতে বড় বড় ১৫ শিল্প গ্রুপ নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে সরকারের কাছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৮০টির বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে ক্যানসার হাসপাতাল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল উৎপাদন, ডাটা সেন্টার ও ডিজিটাল অবকাঠামো স্থাপন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ আটটি খাতে।

জানা গেছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো সরকার বিশ্লেষণ করছে। এর আগে শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি কারখানা লাভজনক করতে বেসরকারি খাতে ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণায় ট্রান্সকম, স্কয়ার, আকিজ, প্যারাগন, প্রাণ-আরএফএল, টিকে, কাজী ফার্মস, নাবিল, বেঙ্গল মিটসহ মোট ১৫টি শিল্প গ্রুপ বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব দিয়েছে প্রাণ আরএফএল, আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপ এবং টিকে গ্রুপ। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে একক এবং যৌথ বিনিয়োগে কারখানা করতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত মে মাসের শেষ দিকে বন্ধ কারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল চালুর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থায় যাতে নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত অর্থ সহযোগিতা পান, সেজন্যই বিশেষ এ তহবিল গঠন করা হয়। ওই তহবিল থেকে গ্রাহকরা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। তহবিলের ঋণে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দিবে। এ তহবিল থেকে নেওয়া অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোগত সুযোগ এবং সরকারের এই ঋণ সুবিধার কারণেই শিল্প গ্রুপগুলো বাড়তি আগ্রহ দেখিয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন রোডম্যাপ চূড়ান্তের পথে সরকার। বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার কাঠামো নিয়ে গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবের সংখ্যা ৩৫টি। কয়েকটি বন্ধ কারখানা দীর্ঘমেয়াদে লিজ নিয়ে এবং যৌথ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে প্রাণ আরএফএল। অটোমোবাইল, এসেম্বলি, রিসোর্ট, ইকো ট্যুরিজম, কৃষি শিল্প, বিল্ডিং মেটেরিয়াল, রেডিমিক্স কারখানা, পেপার মিল, সৌর বিদ্যুৎ, পাদুকা শিল্প, ফার্নিচার, পোলট্রি, ডেইরি ফার্মসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ রয়েছে।

বেসরকারি খাতের ট্রান্সকম গ্রুপ মোট তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আগ্রহের বিনিয়োগ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার হাসপাতাল, ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল ও ডাটা সেন্টার তৈরি করা। তবে এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।

আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মোট ১২টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আকিজ অ্যাগ্রো অ্যান্ড লাইভস্টক লিমিটেড তিনটি চিনিকলে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সৌর বিদ্যুৎ ও হিমাগার নির্মাণের জন্য তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। তারা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের চিনিকলের জায়গাগুলো লিজ নিয়ে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি আকিজ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড আরও ৯টি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্নিচার, রাবার, ইলেকট্রিক ভেহিকল, বিদ্যুৎ এবং আইসিটিতে আগ্রহ দেখা গেছে।

প্যারাগন গ্রুপ ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং সোলার স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। অ্যাগ্রো প্রসেসিং এবং মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড।

ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ সেতাবগঞ্জ সুগারমিল দীর্ঘমেয়াদে লিজ নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন, সবজি ফল প্রক্রিয়াজাত করা, জৈব সার উৎপাদন, বীজ আলু বর্ধন, হিমাগার, সোলার এনার্জির মতো মোট ৯টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যৌথ বিনিয়োগে গাজনভিত্তিক এপিআই ও বায়োফার্মাসিকিউটিক্যালে বিনিয়োগের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছে এ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যাল লিমিটেড। কাজী ফার্মস লিমিটেড দিয়েছে চারটি বিনিয়োগ প্রস্তাব। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, খুলনা ও ঠাকুরগাঁওয়ে জমি ক্রয় বা দীর্ঘমেয়াদে লিজ নিয়ে অ্যাগ্রো প্রসেসিং, কর্ন স্টার্চ ও ফুড প্রসেসিং এবং বেজারেজ উৎপাদনে কারখানা করতে চায়। নাবিল গ্রুপও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে দুটি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় থাকা টি. কে. গ্রুপ অটোমোবাইল কম্পোনেন্ট উৎপাদন, এসেম্বলিং করতে চায়। সব মিলে প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছে ১০টি বিনিয়োগ প্রস্তাব। যেখানে লেদার ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচারিং, সোলার গ্লাস ম্যানুফেকচারিং, ইন্টিগ্রেটেড টেস্কটাইল ম্যানুফেকচারিংসহ সেবা খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।

কৃষি খাদ্যে বেঙ্গল মিট একটি, ইভি সংযোজন, ব্যাটারি সিস্টেম, প্রকৌশল, সিরামিকের মতো খাতে এক্সিলেন্ট সিরামিক গ্রুপ তিনটি, গ্রাম উন্নয়ন কর্ম ইভি, কৃষিযন্ত্রসহ তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া মিল্ক ভিটার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানও একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তারা সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে ৩০ হাজার লিটার উৎপাদন ক্ষমতার একটি আধুনিক রিফাইনারি স্থাপন করতে চায়। যদিও মিল্ক ভিটার নিজস্ব বেশকিছু বন্ধ ও লোকসানি কারখানায় কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ খুঁজছে বলে জানা গেছে।

চলতি মাসের ৮ জুলাই, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অনলাইনে সভায় যুক্ত হয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকারের একক বিনিয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সরকার, দেশীয় উদ্যোক্তা, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তি অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগেই টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ জানতেই এই সভা। পাশাপাশি শিল্প সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার উপায় নির্ধারণ ও অংশীদারিত্বের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা।

এই সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু নাসের খান বলেন, ‘বন্ধ ও অলাভজনক কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে চলতি মাসের ৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান ৮০টির বেশি প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে আটটি খাতের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবনা এসেছে।

সভায় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মোহাম্মদ বিন হারুন বলেন, একই ক্ষেত্রে একাধিক বিনিয়োগকারীর আগ্রহ দেখা গেছে। এই অবস্থায় সরকারের রাজস্ব আয়কে প্রাধান্য দিয়ে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোতে কোন ধরনের বিনিয়োগ পদ্ধতি অধিকতর কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ধারণ করা দরকার। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

এই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সরকারের ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি কারখানার ২০টি গ্যাস ব্যবহারের সুবিধা নেই। বাকিগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রাপ্যতা রয়েছে। দুটি করে প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও পানির সংকট রয়েছে। তবে এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকার সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জানা গেছে, ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত