সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতার কথা বলে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দরপত্রহীন বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান বাতিল করা হয়েছে। অথচ এখন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণ এমনকি এলএনজি কেনাকাটায় দরপত্রের ধার ধারছে না পেট্রোবাংলা। এলএনজির মতো বিলিয়ন ডলারের কেনাকাটায় কৌশলে দরপত্রকে পাশ কাটিয়ে সমঝোতা বা যৌথ দরকষাকষিকে প্রাধান্য দিতে চাইছে জ্বালানি বিভাগ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (সিএনইই) কাজ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে এ কাজ পাচ্ছে চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
গত মাসের প্রথম দিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জিটুজি ভিত্তিতে এলএনজি টার্মিনালটি নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। তবে জুলাইয়ের ১০ তারিখে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। সেই সময় রূপান্তরিত
প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের এলএনজি শাখার মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জিটুজি প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার কারণ হিসেবে জানান, যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদন না নেওয়ায় এটি স্থগিত করা হয়েছে।
পরে আবার বিনা দরপত্রে জিটুজি ভিত্তিতেই টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে বিনা দরপত্রে কাজ দেওয়ার পথই খোলা থাকছে। সরকার বলছে, এটি হবে দেশের তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল। মহেশখালীর দুটি টার্মিনালের পাশেই এ টার্মিনালটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কী ছিল আগে : আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিনা দরপত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নকে। বিগত সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ ’-এর আওতায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ বিধানটি বাতিল করায় বিনা দরপত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সীমিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, দরপত্র না হলে কেন এত ভয় প্রতিযোগিতামূলক দামে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নিজেদের মতো করে সীমিতসংখ্যক কোম্পানিকে সুযোগ দিলে প্রকৃত দর যাচাই সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি প্রতি ইউনিট এলএনজি গ্যাসে রূপান্তরের জন্য ৪৯ সেন্ট চার্জে পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি করে। এরপর সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির মধ্যে চুক্তি সইয়ের পর একই ধরনের সেবা ৪৮ সেন্টে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে একটি চুক্তি করা হয়।
এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিটের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় নরওয়ের একটি বেসরকারি কোম্পানি গোলার পাওয়ার বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাবও দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ওই প্রস্তাবে প্রতি ইউনিট এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তরের চার্জ হিসেবে ৩২ সেন্ট দাবি করা হয়, যা এক্সিলারেট এনার্জির প্রস্তাবিত দরের চেয়ে ১৭ সেন্ট এবং সামিটের চেয়ে ১৬ সেন্ট কম ছিল। অথচ গোলার পাওয়ারের সেই প্রস্তাবে সরকারি অনুমোদন পাওয়া দূরের কথা, আলোচনাতেও স্থান পায়নি।
এখন কী হচ্ছে : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সরকার বিশেষ বিধানের পরিবর্তে জিটুজি পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নিচ্ছে। অর্থাৎ দুই দেশের সরকারের পর্যায়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রেও উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে না।
জিটুজি পদ্ধতিতে শুধু দুই দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো দেশের সরকার অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে ব্যবসা করার সুযোগ পেতে পারে। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি এখন এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও জিটুজিভিত্তিক ক্রয় প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এখন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, দেশীয় মুদ্রায় যা ছয় হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ব্যয় দ্বিগুণ বা ১ বিলিয়ন ডলারও হতে পারে, সে ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে এলএনজি টার্মিনালের ধারণক্ষমতা, রিগ্যাসিফিকেশন করার ক্ষমতা আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে টার্মিনালটি পুরনো হলে ব্যয়ের হেরফের হতে পারে।
জিটুজি ক্রয় প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানির অংশগ্রহণ : দেশ রূপান্তরের হাতে আসা একটি সরকারি নথিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে সরকার বিনা দরপত্রে এলএনজি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। গানভর ইউএসএ এলএলসি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি কোম্পানি।
সরকারি ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫-এর ৯৯(২) ও ১০৭(২) বিধি অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জিটুজি ভিত্তিতে প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াকরণের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন গ্রহণ করা সমীচীন।
পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ৯৯(২)-এ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এর জন্য আইনে নির্ধারিত শর্তপূরণ এবং যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।
বিধি ১০৭(২)-এ জিটুজি ভিত্তিতে পণ্য, কার্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিদেশি সরকার বা সরকার মনোনীত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনার ক্ষেত্রে এ বিধি প্রযোজ্য হতে পারে।
গানভর ইউএসএ এলএলসির প্রস্তাবসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রপ্তানিকারক দেশে চলমান সংঘাত এবং সম্ভাব্য অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতির (ফোর্স মেজর) কারণে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে কাতারের এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৮ সালে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে নতুন ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনার কারণে অতিরিক্ত এলএনজির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
নথিতে বলা হয়, এমন প্রেক্ষাপটে গানভর ইউএসএ এলএলসি ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ছয়টি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নীতিগত অনুমোদন এবং জিটুজি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৬ থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ছয়টি করে কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। গানভর ইউএসএ এলএলসির প্রস্তাবিত প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, নমনীয় শর্তাবলি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত জ্বালানি সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখনো আগের নীতিই কার্যকর রয়েছে। শুধু প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে একই ধরনের কাজ করা হচ্ছে। ফলে সরকার দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছে এমনটি বলা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি ক্রয় বিধিমালায় কিছু শর্ত শিথিল করে সরকারি কেনাকাটা সহজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব শৈথিল্য যতটা না দেশের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তার চেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিস্বার্থে। অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ ধরনের সুযোগ বন্ধ করা উচিত করা উচিত।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি নিঃসন্দেহে অধিকতর গ্রহণযোগ্য। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার কী দামে পণ্য বা সেবা কিনছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করা জরুরি। এলএনজির মতো বড় আর্থিক পরিমাণের পণ্য ক্রয়ে যথাযথ মূল্য যাচাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
