যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা, সংকটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ

পাল্টাপাল্টি এই হামলায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন। 

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৪ এএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে সমুদ্রপথে সবচেয়ে বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে তারা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো ডুবিয়ে দেওয়ার কথা জানায়। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন। খবর রয়টার্স।

রয়টার্স এর প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।

গত এক মাস তুলনামূলক শান্ত থাকার পর আবারও সংঘাত তীব্র হলো। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল।

ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে জর্ডানের দাবি, দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হননি এবং সব সেনার হিসাব পাওয়া গেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হামলা হলে ইরানের প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে তারা সমুদ্রে নতুন ও আরও বড় একটি নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে। প্রস্তাবিত এলাকাটি পাকিস্তানের কাছাকাছি ইরানের উপকূলীয় শহর চাবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

নির্বাচনে প্রভাব ফেলার অভিযোগ ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টি তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে, কারণ ইরান আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পরে জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে এই সংঘাত তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্তও চলতে পারে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রতিবেদনটি যাচাই করতে পারেনি।

এদিকে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাত বেড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় একটি যুদ্ধক্ষেত্রও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

পাঁচ ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাতভর অভিযানে তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। এসব জাহাজে আগুন জ্বলতে থাকা এবং পরে ডুবে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড একটি মার্কিন নৌযানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুইবার লক্ষ্যবস্তু করার পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়। হামলায় কোনো মার্কিন নাগরিক আহত হননি বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে ইরানি ট্যাংকারে হামলার সংখ্যা ১০টিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান যতবার মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর চেষ্টা করবে, ততবার তাদের তেলবাহী ট্যাংকার হারাতে হবে।

অন্যদিকে ইরানের দাবি, তারা দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

বাণিজ্যিক জাহাজেও হতাহত

দুবাই উপকূলের কাছে নোঙর করা তেলজাত পণ্যবাহী হারকিউলিস স্টার নামের একটি ট্যাংকারে হামলায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন। আরেকজন ক্রু নিখোঁজ রয়েছেন বলে জাহাজটির চার্টারার পেনিনসুলা জানিয়েছে।

ব্রিটিশ মেরিটাইম সিকিউরিটি সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওই এলাকার একটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে কাত হয়ে গেছে। এটি হারকিউলিস স্টার কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইরাকের দুই বন্দর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ফুয়েল অয়েল বহনকারী নিউ অ্যান্ড্রোস নামের একটি ট্যাংকার ইরাকি জলসীমায় ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। জাহাজটির ২২ জন ক্রুর কেউ হতাহত হননি।

ইউকেএমটিও আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দুই পাশে—উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরে—বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং সেগুলোর চলাচল অক্ষম হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) ট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সংকটে

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সাফল্যের দাবি করেছিল। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই অগ্রগতি বড় ধাক্কা খেয়েছে।

জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তির মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন দিনে মাত্র ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। অথচ ৩০ আগস্ট নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তা দিনে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত ছিল।

শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, পরিশোধিত জ্বালানির দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা দাম প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৯৪ ডলারের ওপরে উঠে নতুন সর্বকালের রেকর্ড গড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের সরবরাহ, জ্বালানি পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত