দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপ্রধান।
সবশেষ ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মুখোমুখি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময় আরও আটটি নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী থাকায় কোনোটিতেই ভোটের প্রয়োজন পড়েনি। সব প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন দুইজন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর চেয়ারম্যান অলি আহমদ। মুক্তিযুদ্ধে বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা পূর্বে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে আলাদা দল গঠন করেন। এবার তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যদিও জোটটি শুরুতে প্রার্থী না দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদকক্ষে চলবে ভোটগ্রহণ। সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় এই নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, যিনি এই নির্বাচনের 'নির্বাচনি কর্তা' হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যান্য সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালটে এই ভোটগ্রহণ পরিচালিত হবে না। আইন অনুযায়ী, ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর পাশে নিজের নাম ও স্বাক্ষর প্রদান করে সংসদ সদস্যরা নিজ আসনে বসেই ভোট সম্পন্ন করবেন।
নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। সাধারণ নিয়মে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৫০ জন হলেও আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল স্থগিত থাকায় বর্তমানে একটি আসন শূন্য রয়েছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই একজন সংসদ সদস্য হওয়ায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অন্যদিকে, অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সিইসি জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ শুরুর পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভোটদানের সময়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। তবে অন্য সংসদ সদস্যদের ভোটপ্রদানের সময় সম্প্রচার স্থগিত থাকবে। ভোটগণনা ও সংসদ কক্ষে ফল ঘোষণার মুহূর্তটি পুনরায় সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এবং পরবর্তীতে সরকারি গেজেট প্রকাশিত হবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদীয় আসন বাতিল হয়ে যাবে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে ৩৪৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির হাতে রয়েছে ২০৯টি আসন, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। এই সমীকরণের ফলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে সংসদের চিফ হুইপ মারফত জানা গেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ১৮ জন ব্যক্তি ২২টি মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ মেয়াদের রাষ্ট্রপতি অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭৫ সালে দেশীয় শাসন ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে রূপান্তরিত হলেও ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে বাংলাদেশ।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। ওই নির্বাচনে ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২টি ভোট। তৎকালীন ৩৩০ জন এমপির মধ্যে ২৬৪ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন।
দীর্ঘ ব্যবধানের পর আয়োজিত আজকের এই নির্বাচন সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট, ভোট হবে যেভাবে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে, কীভাবে-সংবিধান কী বলছে?