ডিলারের দোকানে গেলে বলা হয়—সার নেই, সরবরাহ কম, পরে আসেন। অথচ কিছুক্ষণ পরই বাড়তি দাম দিলে মিলছে সেই সার। নাটোরের গুরুদাসপুরে এমন অভিযোগ এখন অনেক কৃষকের মুখে মুখে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার কেনা যেন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে চাষাবাদের মৌসুমে বাড়তি টাকা গুনে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে টিএসপি ও ডিএপি সার নিয়ে। কৃষকদের ভাষ্য, বাজারে সরবরাহ থাকার পরও অনেক ডিলারের কাছে নির্ধারিত দামে সার মিলছে না। কোথাও ‘সংকটের’ কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত দাম চাওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা।
চাঁচকৈড় বাজারে সার কিনতে আসা কৃষক শফি জানান, দুই বস্তা টিএসপি সারের জন্য তিনি একাধিক ডিলারের কাছে ঘুরেছেন। কেউ বলেছেন সার নেই, কেউ বলেছেন সংকট চলছে। পরে পরিচিত এক কৃষকের কাছ থেকে জানতে পারেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে।
শফি বলেন, পরে আবার দোকানে গিয়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা টিএসপি কিনেছি। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। চাষ করতে হলে সার লাগবেই, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনেছি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গুরুদাসপুর উপজেলায় বিসিআইসির ১০ জন এবং বিএডিসির ১০ জনসহ মোট ২০ জন অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন। চলতি মাসে ডিলারদের মধ্যে ১৭০ টন টিএসপি, ২৫৮ টন ডিএপি, ১৯৫ টন এমওপি এবং ৭২০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডিলাররা বরাদ্দকৃত সার উত্তোলনও করেছেন।
এ তথ্যের পরও মাঠপর্যায়ে কেন কৃষকেরা নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন না—সে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ডিলারের গুদামে সার থাকলেও সরকারি দামে তা পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের দাবি, উপজেলা কৃষি অফিসে অভিযোগের কথা জানানো হলেও বাজারে এর প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
তবে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিলারদের কোনো গোপন যোগসাজশ রয়েছে—কৃষকদের এমন অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাজার ঘুরে কৃষক ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কিছু সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকার পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকার পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা, এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকার পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার ৮০ টাকা এবং টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা বিসিআইসি ডিলারদের প্রতিনিধি আব্দুস সোবাহান অবশ্য অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কৃষকদের কাছ থেকে দাম নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো সার স্থানীয়ভাবে সংকট হলে বাইরে থেকে আনতে পরিবহনসহ অতিরিক্ত খরচ হয়। সেই খরচের বিষয়ে কৃষকদের জানানো হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব কে এম রাফিউল ইসলাম বলেন, কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মজুত করা সার রেজিস্টারে যথাযথভাবে না তোলার অভিযোগে তিন ডিলারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, উপজেলায় বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে সিন্ডিকেট কিংবা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিষয়ে নানা অভিযোগ শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো কৃষক সরাসরি লিখিত অভিযোগ করেননি। তারপরও বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, কৃষকেরা যেন সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুদাসপুরে কোনো ধরনের সার সিন্ডিকেট চলতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কৃষকের কাছে সার শুধু একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি সময়মতো ফসল বাঁচানোর অন্যতম ভরসা। বীজ বোনা থেকে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যার প্রয়োজন পড়ে। সেই সার যখন নির্ধারিত দামের বদলে বাড়তি টাকায় কিনতে হয়, তখন বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে কৃষকের কাঁধেই।
দিন শেষে মাঠে ঘাম ঝরানো কৃষক খুব বেশি কিছু চান না—সময়মতো প্রয়োজনীয় সার, ন্যায্য দাম এবং হয়রানিমুক্ত একটি বাজার। বরাদ্দের হিসাব যদি কাগজে যথেষ্টই থাকে, তবে সেই সার ন্যায্যমূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছানোই এখন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারের দাম বেশি নিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা : কৃষিমন্ত্রী
নওগাঁয় বেড়েই চলেছে সারের দাম ও পাচার, অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সিন্ডিকেট