অন্য বকেয়ায় আটকে যায় সনদ

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

জয়পুরহাট পৌরসভায় নাগরিকত্ব সনদ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদসহ অন্যান্য সেবা নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন এলাকাবাসী। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, বাধ্যতামূলক সাবমারসিবল পাম্পের সাড়ে ছয় হাজার টাকা ফি পরিশোধ, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ অন্যান্য বকেয়া নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করার অঙ্গীকার না করলে মিলছে না কোনো সনদ। পৌর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার এমন নিয়মে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, রাজস্ব ও আয় বাড়ানোর জন্য তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে পৌর প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক বলছেন, অন্য বকেয়া আদায়ের জন্য নাগরিকদের মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। তদন্ত করে নেওয়া হবে।

সম্প্রতি সাবেক কাউন্সিলর ও স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে সাময়িকভাবে বকেয়া পরিশোধ ব্যতিরেকেই কিছু সনদ দেওয়া হলেও হয়রানি কমেনি নাগরিকদের। সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতারা বলছেন, নাগরিকের ওপর এটা অন্যায়, জুলুম। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক খানের এমন নিয়ম বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

পৌরসভা কার্যালয়ে সরেজমিন কথা হয়, পৌরসভার গাড়িয়াকান্ত এলাকার রায়হান, বুলুপাড়ার সুমন হোসেন, হাতিল গাড়িয়াকান্তর মানিক, পূর্ব জানিয়ার বাগানের আশিক হোসেনসহ অনেকের সঙ্গে। তাদের কেউ কেউ নাগরিকত্ব, মৃত্যু সনদ, মাতৃকালীন ভাতার স্বাক্ষর, ওয়ারিশান সনদসহ অন্যান্য সনদ নিতে এসেছেন। কিন্তু বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্সসহ অন্যান্য ফি পরিশোধ করার পর তাদের কাছে আবার নতুন করে সাবমারসিবল পাম্পের সাড়ে ৬ হাজার টাকা ফি চায় কর্তৃপক্ষ। তারা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ এত টাকা কোথায় পাব। দিনমজুরি করে কোনোভাবে সংসার চলে। এমন নিয়মের জন্য আমরা বেকায়দায় পড়েছি। আমরা স্থানীয় লোকজন ও সাবেক কাউন্সিলরদের ডাকার পর সনদগুলো দিয়েছে। বর্তমানে কৌশল পরিবর্তন করে হোল্ডিং ট্যাক্স, সাবমারসিবল পাম্পসহ অন্যান্য বকেয়া পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সময় উল্লেখ করে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নিচ্ছেন।’

পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আবুল মুনসুর মন্টু, খায়রুল আলম নয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভায় এখন যা চলছে তা জনগণের প্রতি জুলুম। আমরা পৌরসভায় আসার পর বাগ্বিত-া হলে উপস্থিত কয়েকজনকে সনদ দেয়। কিন্তু পরে জনগণ সনদ নিতে এলে কতদিনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করবে এমন অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নতুন কৌশল অবলম্বন করে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।’

পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর সাহেদুল আহসান সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমিসহ খনজনপুর এলাকার আব্দুর রহিম, মোত্তালেব, লুৎফর, আনোয়ার, হারুন নামে কয়েকজন জেলা প্রশাসক বরাবর গত ৬ আগস্ট লিখিত অভিযোগ করেছি। বিগত পৌর পরিষদ পৌরবাসীর জন্য বিনামূল্যে পৌর এলাকায় লাশের গাড়ির ব্যবস্থা করেন। এখন ওই লাশের গাড়িও ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫২০ টাকা করে। আমরা জয়পুরহাট পৌরবাসী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। তাকে সহযোগিতা করছে পৌরসভার কয়েক কর্মকর্তা। বিষয়টি তদন্ত করে সব ধরনের সেবা সহজতর করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’

জয়পুরহাট শহর বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান বকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভা এতদিন যে নিয়মে চলেছে, সেই নিয়মেই চলবে। নতুন করে কোথায় কি সাবমারসিবল পুতেছে, কোথায় কি করেছে এই নিয়ম নিয়ে আসা ঠিক নয়। যদি আনতে হয় পৌর পরিষদ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এলে চিন্তাভাবনা করে তখন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। যেটি ভালো হয় সেটি করবেন। কিন্তু এখন জনগণের সঙ্গে এটি করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে। কাজেই এটি অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।’

পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভার স্বার্থে আয় বৃদ্ধি ও ফি আদায়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পৌরসভা যেহেতু স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিষ্ঠান সেহেতু আয় বৃদ্ধির স্বার্থে পৌরসভা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

জয়পুরহাট পৌরসভা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি পৌরসভায় অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। তখন আমি ঢাকায় ছিলাম। একটা সেবার জন্য অন্য আরেকটি নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ প্রচলিত কোনো আইনে নেই।  প্রশাসক হিসেবে তদন্ত করে যদি কেউ দায়ী থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক আল মামুন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভার একটি সেবা নেওয়ার জন্য কোনো বকেয়া থাকলে অন্য সেবা দেওয়া যাবে না এমন লিখিত অভিযোগ এখনো আমার কাছে আসেনি। সেবা নিতে আসা কারও হোল্ডিং ট্যাক্সসহ অন্য কোনো ফি বকেয়া থাকলে তাকে যেন সেবা থেকে বঞ্চিত করা না হয়। এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই মানুষের নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত