ক্যানসারে একে একে স্বজনহারা দুই শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

দাদা, বাবা ও দুই চাচাকে ক্যানসারে হারিয়েছে ১১ বছরের ইসরাত জাহান ও পাঁচ বছরের জুনায়েদ ইসলাম। তাদের মা ঝরনা বেগমও এখন চতুর্থ পর্যায়ের ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত। একই পরিবারের আরেক সদস্য বড় চাচা শফিকুল ইসলাম লড়ছেন চতুর্থ পর্যায়ের কোলন ক্যানসারের সঙ্গে। একের পর এক স্বজন হারিয়ে দুই শিশুর জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নের আতানারায়ণপুর গ্রামের পরিবারটি একসময় ছিল সচ্ছল ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিক্রি ও বন্ধক রাখতে হয়েছে জমিজমা। বেড়েছে ঋণের বোঝা। স্বজনদের দাবি, কয়েক বছরে শুধু চিকিৎসার পেছনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা।

পরিবারের কর্তা আব্দুল হামিদ ছিলেন ব্যবসায়ী। তার পাঁচ ছেলের সবাই ছিলেন চাকরিজীবী। কেউ কলেজ শিক্ষক, কেউ স্কুল বা মাদ্রাসার শিক্ষক। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে ক্যানসার কেড়ে নিয়েছে আব্দুল হামিদ ও তার তিন ছেলের জীবন। এখন একই রোগে আক্রান্ত পরিবারের আরেক সদস্য শফিকুল ইসলাম।

২০২০ সালে লিভার ক্যানসারে মারা যান আব্দুল হামিদের ছেলে সাদরুল ইসলাম। ২০২২ সালে একই রোগে মারা যান আব্দুল হামিদ। ২০২৪ সালে মারা যান মামুন অর রশিদ। তিনি ছিলেন আত্রাই আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক। এরপর মারা যান মোহনপুর মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক এসারুল ইসলাম। মৃত্যুকালে তিন ভাইয়ের বয়সই ছিল প্রায় ৪০ বছরের কাছাকাছি।

এখন ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন পরিবারের আরেক সদস্য শফিকুল ইসলাম। আতানারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের কোলন ক্যানসার শনাক্ত হয় ২০২২ সালে। অস্ত্রোপচারের পরও তার চিকিৎসা চলছে। বর্তমানে তার ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, বাবা ও পরপর তিন ভাইকে ক্যানসারে হারিয়েছি। এখন নিজেকেও একই রোগের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। পরিবারের চিকিৎসায় প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জমি বিক্রি ও বন্ধক রাখতে হয়েছে। এখন আমরা ঋণগ্রস্ত।

স্বামীকে হারিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ঝরনা : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করা ঝরনা বেগম ২০১১ সালে এসারুল ইসলামকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় ইসরাত ও জুনায়েদ। স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাকে চারবার ভারতে যেতে হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসায় ব্যয় হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা।

শেষবার চিকিৎসকরা যখন এসারুল ইসলামের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বলে জানান, তখন ভারতে অবস্থানরত ঝরনা ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার মস্তিষ্কে ক্যানসার ধরা পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র এক মাস পর তার ব্রেন ক্যানসার শনাক্ত হয়।

বর্তমানে ঝরনার ক্যানসারও চতুর্থ পর্যায়ে। ঢাকায় তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। নিয়মিত কেমোথেরাপি চলছে। স্ট্রোকের কারণে তার ডান হাত ও পা অবশ হয়ে গেছে। কথা বলতেও কষ্ট হয়। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

তবুও সংসার থেমে নেই। এক হাত দিয়েই রান্না করেন ঝরনা। স্কুল থেকে ফিরে মাকে কাজে সাহায্য করে পাঁচ বছরের জুনায়েদ। আর ইসরাত অনেক সময় আগের দিনের তরকারি দিয়ে ভাত নিয়ে স্কুলে যায়।

ঝরনা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। মানুষের সহায়তায় ওষুধ কেনেন। অর্থাভাবে অনেক সময় নিয়মিত ওষুধও খেতে পারেন না। প্রতি মাসে তার প্রায় আট হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। স্বামীর চিকিৎসার জন্য নেওয়া ব্যাংকঋণের এখনো প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বাকি। সম্প্রতি তিন মাসের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে নিজের মোবাইল ফোনটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।

আমার বাবা নেই : সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই সন্তানকে পাশে নিয়ে কান্না করছেন ঝরনা। কথা বলার সময় তার মুখে জড়তা স্পষ্ট। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ইসরাত। বাবার চিকিৎসার সময় মা-বাবার সঙ্গে চারবার ভারতে গিয়েছিল সে। হাসপাতালে অপেক্ষার সময় রঙ-পেনসিল দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জাতীয় স্মৃতিসৌধের ছবি আঁকত। এক চিকিৎসক তার আঁকা ছবি দেখে তাকে খাতা, রঙ ও পেনসিল কিনে দিয়েছিলেন। সেই ছবিগুলো এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছে ইসরাত।

ইসরাত বলে, আমার সহপাঠীদের বাবা তাদের সঙ্গে আসে। তাদের জন্য অনেক কিছু কিনে দেয়। কিন্তু আমার বাবা নেই। আমাকে কেউ কিছু কিনে দেয় না। মা-ও অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। মাত্র পাঁচ বছরের জুনায়েদ হয়তো এখনো পুরোপুরি বোঝে না ক্যানসার কী। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি আর মায়ের অসুস্থতা তার ছোট্ট জীবনে তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা।

প্রতিবেশীরা জানান, একসময় পরিবারটি এলাকায় সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারের প্রায় সবাই চাকরিজীবী ছিলেন। কিন্তু একের পর এক মৃত্যু এবং দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয়ে পরিবারটি এখন চরম সংকটে পড়েছে। দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

মোহনপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হোসেন শামীম বলেন, পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। রোগী কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকেও কিছু ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে রাজশাহীর এসওএস শিশু পল্লীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতিও রয়েছে।

আতানারায়ণপুরের এই পরিবারে ক্যানসার শুধু কয়েকজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে সচ্ছলতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও। তবুও ইসরাত ছবি আঁকে, পড়াশোনা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। পরিবারের স্বজনদের একটাই প্রত্যাশা মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি দুই শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যৎ যেন ক্যানসারের নির্মম ছায়ায় হারিয়ে না যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত