নথিতে কাজ শেষ, মাঠে অস্তিত্বহীন

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম

বান্দরবানে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রকল্পে কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। বরাদ্দের পুরো টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রকল্পের অধিকাংশ কাজের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরনো কাজকে নতুন প্রকল্পের কাজ দেখানোসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র ও ক্রয়বিধি না মানার অভিযোগও উঠেছে। ফলে পাহাড়ে নিরাপদ পানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও প্রকল্পের কাগুজে সফলতা দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে পুরো অর্থ।

জানা যায়, বান্দরবান জেলায় বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেয় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষংছড়িসহ জেলার সাতটি উপজেলায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করার কথা। আর প্রকল্পের কাজগুলো হলো ১০টি নলকূপ স্থাপন, ১২টি জিএফএস লাইন সংস্কার, ১০টি জিএফএস নতুন লাইন নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, পানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ ৩০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগসহ ৮৫টি পাম্প হাউজ নির্মাণ, মিমি পাম্পসহ ৮৫টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ৮৫ কিলোমিটার বিভিন্ন ব্যাসের পাইপলাইন, ৮৫টি স্ট্যান্ড পোস্ট স্থাপনসহ ৫৮৩টি রিংওয়েল স্থাপনের কাজ ছিল এ প্রকল্পের অধীনে।

এদিকে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি পাম্প-হাউজ, নলকূপ ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের কাজের দৃশ্যমান থাকলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজের নেই কোনো অস্তিত্ব।

মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বরত স্টাফরা জানান, কিছু কিছু এলাকায় নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে, কিছু এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের কাজও করা হয়েছে। তবে ঠিক কতটি এবং কোন প্রকল্প থেকে করা হচ্ছে তা বলা যাচ্ছে না। এ ছাড়া জিএফএস, গভীর নলকূপ, পাবলিক টয়লেট, স্ট্যান্ড পোস্টসহ আরও বেশ কয়েকটি কাজের কথা তারা বলতে পারছেন না।

অভিযোগ রয়েছে, জুন ক্লোজিংয়ের অজুহাতে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে নামেমাত্র কাজ করে ঠিকাদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে বরাদ্দের পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

রোয়াংছড়ি উপজেলার সমাজিক নেতা মংসা প্রু মার্মা বলেন, ‘প্রতি বছর রিংওয়েল, নলকূপসহ জিএফএসের মাধ্যমে পানি সরবরাহের নামে শতকোটি টাকা প্রকল্প হাতে নেয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। নামমাত্র কাজ করে প্রকল্পের টাকায় কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হয়। কিন্তু পাহাড়ে পানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পানি প্রকল্পগুলো পানিতে চলে যায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না।’ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে ক্রয় পরিকল্পনা মোট সাতটি ভাগে ভাগ করা হয় এবং তা গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য বরাদ্দও রাখা হয় ৭ লাখ টাকা। কিন্তু অভিযোগ আছে, প্রকল্প পরিচালক ও উপ-প্রকল্প পরিচালক এই প্যাকেজকে ৭৯টি ভাগে ভাগ করেন। এক্ষেত্রে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের (ওটিএমএইচওপিই) অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী পরিচালক ও এ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক অনুপম দে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে প্রকল্প পরিচালক রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত শহরে দুটি কাজের পরিদর্শন করেছি। সেখানকার সব কাজ শেষ হয়েছে।’

বান্দরবান পার্বত্য জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মার্মা বলেন, ‘বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে যে ৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, এ প্রকল্পের কতটুকু কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে তা মাঠ পর্যায়ে খতিয়ে দেখা দরকার।’    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত