দেড় দশক আগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন খুঁজে পাওয়ায় সাবেক বিচারক মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কবির উদ্দিন প্রামাণিক বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগের প্রশাসন-২ অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘটনার সময় তিনি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া চৌকি আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিল শুনানি শেষে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এসেছে, ২০১০ সালে আসামি নূর মোহাম্মদের জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইন ও ফরমের স্পষ্ট অবহেলা করা হয়েছিল। জবানবন্দি ফরমের ৫ নম্বর কলামের প্রশ্নাবলি আসামিকে সঠিকভাবে না বুঝিয়ে কেবল তিনটি প্রশ্ন লেখা হয়েছিল।
এ ছাড়া জবানবন্দিটি স্বেচ্ছায় ও সত্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করার জন্য ৭, ৮ ও ৯ নম্বর কলামে প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য বা স্মারকলিপি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি নির্ধারিত স্থানে আসামির স্বাক্ষর না নিয়ে অতিরিক্ত একটি আলাদা পাতায় সই নেওয়া হয়েছিল। উচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার ২ ও ৩ উপধারার বিধান মেনে জবানবন্দি না নেওয়ায় তা আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডদানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
মামলার শুনানি চলাকালে হাইকোর্টের নির্দেশে সাবেক ওই বিচারক সশরীরে আদালতে হাজির হন। তবে আদালতের বিভিন্ন প্রশ্নে তিনি কেবল জানান যে ফরমের কয়েকটি কলামে তিনি কিছু লেখেননি।
আদালত রায়ে উল্লেখ করে, সশরীরে হাজির হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আচরণ ও বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার আইনি গুরুত্ব আজও অনুধাবন করতে পারেননি। এটি তার চরম অযোগ্যতা ও পেশাগত অসদাচরণের প্রমাণ। বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাকে ‘অযোগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আদালত তৎকালীন প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনার নথি পাঠিয়েছে।
মামলাটিতে পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালে নূর মোহাম্মদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে হাইকোর্ট বিচার প্রক্রিয়ার নানা ত্রুটি ও দীর্ঘ ১৬ বছর (বিচারাধীন ৯ বছর ও কনডেম সেলে ৭ বছর) কারাভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে খালাসের রায় দেয়। মানসিকভাবে অসুস্থতার তথ্য থাকায় তাকে মুক্তির আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার জবাবে যুগ্ম সচিব কবির উদ্দিন প্রামাণিক জানান, তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগের রায় না আসা পর্যন্ত উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা মানার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জের আবেদন বাতিল করল হাইকোর্ট
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ