মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। আসামির করা আপিল আবেদন খারিজ এবং ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানি শেষে সোমবার হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ও উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামির চরম দণ্ডাদেশ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের এ রায়ে বিচারপ্রার্থী পরিবার ও স্থানীয় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে সন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে এক মর্মান্তিক পাশবিকতার শিকার হয় আট বছরের ছোট শিশুটি। ধর্ষণের ফলে গুরুতর আহত ও সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরে অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে ৮ মার্চ তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যায় টানা কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ১৩ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
ঘটনার পরপরই ৮ মার্চ শিশুটির মা বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় হিটু শেখকে প্রধান আসামি করে মোট চারজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে শিশুটির করুণ মৃত্যুর পর দায়ের করা ওই মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার নতুন অভিযোগ সংযুক্ত করা হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত কাজ শেষ করে। ঘটনার মূল আসামি হিটু শেখকে গ্রেপ্তারের পর ১৫ মার্চ তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজ দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা অত্যন্ত তৎপরতার সাথে তদন্ত সম্পন্ন করে মাত্র এক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ২৩ এপ্রিল বিচারিক আদালত প্রধান আসামি হিটু শেখের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় এবং অন্য তিন আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর জন্য অভিযোগ গঠন করেন।
দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ঘটনার মাত্র দুই মাস ১১ দিনের মাথায় ২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে একমাত্র প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অপর তিন আসামি—শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখ এবং তাদের মা জাহেদা বেগমকে খালাস প্রদান করা হয়।
নিম্ন আদালতের ওই রায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি আসামি হিটু শেখও তার সাজা মওকুফের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির পূর্বশর্ত হিসেবে হাইকোর্টের নির্দেশনায় সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) মামলার যাবতীয় নথিপত্র বা পেপারবুক তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। জুন মাসে পেপারবুক হাইকোর্টে পৌঁছানোর পর দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। অবশেষে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজাই হাইকোর্টে চূড়ান্তভাবে বহাল রইল।
শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা: হাইকোর্টের রায় আজ
শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পেপারবুক প্রস্তুত, শুনানি শিগগিরই
আছিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি স্বামী-শ্বশুর গ্রেপ্তার