চোখের আলো নেই, তবুও স্বপ্নের আলোয় ঘর ভরে গফুরের

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৫ এএম

একটি শিশু, যে একদিন অন্য সবার মতোই পৃথিবী দেখত। কিন্তু মাত্র ৯ বছর বয়সে টাইফয়েড জ¦রে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় তার দুই চোখের দৃষ্টি। এক নিমিষেই বদলে যায় পৃথিবী। যে চোখ দিয়ে একদিন মায়ের মুখ দেখেছিল, সেই চোখ দিয়েই আর কোনো দিন আলো দেখা হলো না। চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের কাছে চিকিৎসার খরচ ছিল অনেক বড় বোঝা। অভাবের সংসারে থেমে যায় উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা।

আর সেই থেকেই শুরু হয় ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের শিশিরচালা গ্রামের আব্দুল গফুরের অন্য জীবন। চোখে আলো নেই। কিন্তু বুকের ভেতর আছে বাঁচার তীব্র আকাক্সক্ষা। অন্যের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকা নয়। নিজের হাতে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় কাজের সুযোগ পাননি গফুর। অনেক দরজা তার সামনে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই হয়তো ভেবেছেন, ‘এই মানুষটি আর কী-ই বা করতে পারবে?’ কিন্তু গফুর জানতেন চোখে না দেখলেও হাত তো আছে। শরীরের শক্তি আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হাল না ছাড়ার মানসিকতা আছে। সংসারের বোঝা হতে চাননি তিনি। শুরু করেন কৃষিকাজ। যে মাটির রঙ তিনি দেখতে পান না, সেই মাটিতেই বুনতে থাকেন স্বপ্নের বীজ। এরপর আসে জীবনের আরেক মোড়। ২০১৫ সালে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে শুরু করেন লেয়ার মুরগির খামার।

শুরুটা সহজ ছিল না। মুরগির খাবার দিতে হবে। খামার পরিষ্কার করতে হবে। মুরগির যতœ নিতে হবে। ডিম সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে, গফুর তো চোখে দেখেন না! তাহলে কীভাবে? উত্তরটা দিয়েছেন গফুর নিজেই। হাতের স্পর্শ, অভিজ্ঞতা আর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম দিয়ে। মুরগির ডাক শুনে বুঝতে পারেন তাদের অবস্থা। স্পর্শে বুঝতে পারেন অনেক কিছু। অভ্যাস আর অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের খামার নিজেই সামলাতে হয়। আজ মুরগির খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে ডিম সংগ্রহÑ অনেক কাজই নিজের হাতে করেন গফুর। চোখ তাকে পথ দেখায় না। তার হাতই যেন তার চোখ।

এক সময় যে মানুষটিকে কেউ কাজ দিতে চায়নি, আজ তার হাতেই সংসারের চাকা।

পরিবারের কণ্ঠে গফুরের গল্প

পরিবারের সদস্যরা আবেগ নিয়ে বলেন, ছোট বয়সে গফুর যখন চোখের দৃষ্টি হারান, তখন পরিবার ভেবেছিল তার ভবিষ্যৎ কী হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভয়কে ভুল প্রমাণ করেছেন গফুর। তার বাবা বলেন, ‘ছোট বয়সে চোখের আলো হারিয়েছে। তখন মনে হয়েছিল, ওর জীবনটা হয়তো শেষ হয়ে গেল। কিন্তু গফুর আমাদের ভুল প্রমাণ করেছে। ও কারও বোঝা হতে চায়নি। নিজের হাতে কাজ করে সংসারে টাকা দেয়। ওর কষ্ট আমরা দেখেছি, আবার ওর সাফল্যও দেখছি। ওকে নিয়ে আমরা গর্ব করি।’ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সহযোগিতা গফুরের এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ঘাটাইল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বাহাউদ্দীন সারোয়ার রিজভী বলেন, ‘আব্দুল গফুর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও অত্যন্ত আগ্রহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে খামার পরিচালনা করছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে সরকারি মেডিসিন বরাদ্দসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

তার মতো উদ্যোক্তাদের আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।’

যিনি প্রথম গফুরের স্বপ্নে সাহস জুগিয়েছিলেন সেই ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রায় দশ বছর আগে গফুরের সংগ্রামের কথা জানতে পারি। তখন তাকে খামার করার পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়েছিল। অনেক খামারি বিভিন্ন কারণে ঝরে গেলেও গফুর টিকে আছে। নিজের অদম্য চেষ্টা দিয়ে সে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটা সত্যিই আনন্দের বিষয়।’ গফুরের খামারে শুধু মুরগি নেই আছে একটি স্বপ্ন। এখানে আছে তার মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা। আছে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার লড়াই। আছে সমাজকে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ‘গফুর অন্ধ হতে পারি, কিন্তু অক্ষম নই।’ প্রতিদিন যখন খামারে মুরগির খাবার দেন, তখন হয়তো তিনি পৃথিবীর আলো দেখতে পান না। কিন্তু তার মনে তখন অন্য এক আলো জ¦লে। সেই আলো স্বাবলম্বী হওয়ার আলো।

আব্দুল গফুর তাই শুধু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খামারি নন, তিনি একজন স্বাবলম্বী মানুষ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত