মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি (রহ.) উপমহাদেশের খ্যাতনামা আলেম। ফিকহ ও ফতোয়ার জগতে তার গভীর প্রজ্ঞা আলেম সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে এবং সাধারণ মানুষকে উপকৃত করেছে। তাসাউফ, তাজকিয়া ও দাওয়াতের ময়দানে তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান। তার ৩২ খণ্ডের ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া আজও অসংখ্য আলেমের ইলমি সহায়তার অন্যতম মাধ্যম।
মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি (রহ.) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সাহারানপুর জেলার গাঙ্গুহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা হামেদ হাসান (রহ.) ছিলেন শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর ছাত্র এবং রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি (রহ.)-এর মুরিদ। তার বংশপরম্পরা প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর সঙ্গে যুক্ত।
শায়খুল হিন্দ (রহ.)-এর সান্নিধ্যে তার প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। পরে হাফেজ করিম বখশ (রহ.) ও হাফেজ আবদুল করিম (রহ.)-এর কাছে কোরআন হিফজ করেন। পাশাপাশি নিজ আগ্রহে উর্দু ভাষাও আয়ত্ত করেন।
১৩৪১ হিজরিতে তিনি মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরে ভর্তি হন। সেখানে সরফ, নাহু, ফিকহসহ বিভিন্ন প্রাথমিক ও উচ্চতর কিতাব অধ্যয়ন করেন। ১৩৪৮ হিজরির শাওয়াল মাসে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে হেদায়া, মিশকাত ও দাওরা পড়েন। শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর কাছে বুখারি শরিফ ও তিরমিজি শরিফ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। পরে মাজাহিরুল উলুমে ফিরে দাওরায়ে হাদিসের কিতাবগুলো পুনরায় অধ্যয়ন করেন এবং তাজভিদ ও কেরাতের শিক্ষাও সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পরই তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। ১৩৫১ হিজরির জিলকদ মাসে মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তী সময়ে সহকারী মুফতির দায়িত্বও পালন করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় তিনি বিভিন্ন কিতাবের দরস দেন এবং ফতোয়ার খেদমত করেন। তার অসাধারণ মেধা, প্রখর স্মৃতিশক্তি, তাকওয়া ও ইলমি যোগ্যতা অল্প সময়েই তাকে আলেম সমাজে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়।
১৩৭১ হিজরি থেকে প্রায় ১৪ বছর তিনি জামেউল উলুম কানপুরে মুহতামিম, মুফতি ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৩৮৫ হিজরিতে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মুফতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন তিনি সেখানে ফতোয়া প্রদানের পাশাপাশি বুখারি শরিফের দরসও দেন।
ইলমের পাশাপাশি তার জীবন ছিল আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় সমৃদ্ধ। তিনি শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.)-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং পরে তার কাছ থেকে খেলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। শায়খ জাকারিয়া (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি তার বিশিষ্ট উত্তরসূরিদের একজন হিসেবে তাজকিয়া ও ইহসানের মেহনত অব্যাহত রাখেন।
দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে তার জীবন ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লেও তিনি দেশ-বিদেশে সফর করে মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করেছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ছাড়াও আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে তিনি সফর করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি চারবার বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯৯৬ সালের রমজানে তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশে সফর করেন। ঢাকার মালিবাগ মাদ্রাসার জামে মসজিদে তিনি এক মাস ইতিকাফ করেন। সে সময় দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক আলেম, মুরিদ ও ভক্ত তার সঙ্গে ইতিকাফ, জিকির ও তাজকিয়ার মজলিসে শরিক হন।
ফিকহ ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের নানা সমস্যার শরিয়তসম্মত সমাধান তিনি লিখিতভাবে প্রদান করেছেন। এসব ফতোয়া পরবর্তীতে ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
তার ব্যক্তিজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অনাড়ম্বরতা, তাকওয়া ও পরহেজগারি। জীবনের শেষ সময়েও ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে তিনি অবিচল ছিলেন। ১৯৯৬ সালে দাওয়াতি কাজে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় সফর করেন। সেখানে ২ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়।
লেখক : ইসলামি গবেষক