ভোরের রাজধানী ভয়ংকর

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৯ এএম

গত শনিবার ভোর ৫টা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কুতুবখালীর ধোলাইপাড় পকেট গেট এলাকা। সড়কে সুনসান নীরবতা। দূরে কোথাও দেখা গেছে দুয়েকটি রিকশা। হাতেগোনা কয়েকজন মুসল্লি ফজরের নামাজ পড়তে বের হন। ধোলাইপাড় বাসস্ট্যান্ড হয়ে পকেট গেট দিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিকে যাচ্ছিল কয়েকটি মালবাহী ট্রাক। কুতুবখালী মসজিদ পেরোতেই একটি ট্রাকের পেছনে উঠে যান এক ছিনতাইকারী। চাকু দিয়ে দ্রুত রশি কেটে তরকারির বস্তা নিচে ফেলেন। পেছনে দৌড়ে আরেকজন সেগুলো সংগ্রহ করে পাশের গলিতে রাখেন। চালক টের পেয়ে ট্রাক থামাতেই ওই ছিনতাইকারী নেমে যান এবং দুজনই গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন। একটু সামনে এগিয়ে ছিনতাইয়ের প্রতিবাদ করার সাহস হয়নি চালক ও তার সহকারীর।

পরে নিরুপায় হয়ে ত্রিপল দিয়ে বাকি মালামাল বেঁধে গন্তব্যের দিকে চলে যান তারা। পুরো সময় সড়কে পুলিশের কোনো উপস্থিতি চোখে পড়েনি। ট্রাকচালক যে তৎক্ষণিক প্রতিকার চাইবেন, সে জন্য ছিল না পুলিশের টহল টিম। একই ঘটনা গত রবিবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে উত্তরা জসিম উদ্দিন রোডেও ঘটে। সুনসান নীরবতার মধ্যে এক পথচারীর কাছ থেকে দুই ছিনতাইকারী একটি মোবাইল ফোন নিয়ে চম্পট দেয়।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ধোলাইখাল পকেট গেট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট চলাকালে মো. শাহ আলম নামে এক কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় চার যুবক। আশপাশের সিএনজি গ্যারেজ ও বস্তি ঘিরে ছিনতাইকারীদের আনাগোনা থাকায় এলাকাটি ‘অপরাধপ্রবণ’ হিসেবে পরিচিত হলেও পুলিশের নিয়মিত টহল নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সেখানেও কোনো টহল পুলিশ ছিল না। ঢাকার বিভিন্ন স্থানেও একই পরিস্থিতি। সর্বশেষ গত শনিবার ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনিই এমন ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মারাও যান।

রাত গভীর হলে বাড়ে অপরাধীদের তৎপরতা : প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে হত্যাকা- থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। রাত গভীর হওয়ার পর সড়কগুলোতে মূলত ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপতৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা এবং নির্জন ফ্লাইওভারগুলোতে এই অপরাধ বেশি ঘটে। ভোররাতে দূরপাল্লার নৈশকোচ থেকে নামা যাত্রী এবং কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিএনজি অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে গিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, নগদ অর্থের লেনদেন, যানজট, রাত ও ভোরের নির্জন সড়ক এবং অপরাধীদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসব কারণে রাজধানীতে ছিনতাই বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি ভোর ও রাতে কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত আলো, নজরদারি ও টহলের ঘাটতিও অপরাধের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। অনেক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার পুরনো অপরাধে জড়াচ্ছে।

ঢাকার যেসব স্থানে হচ্ছে নানা অপকর্ম : বর্তমানে রাজধানীতে ডিএমপির তালিকাভুক্ত প্রায় ১৪শ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এর বাইরেও রাজধানীজুড়ে হাজারের বেশি ভাসমান ছিনতাইকারী রয়েছে। যারা ঢাকার বাইরে থেকে কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়ে আবার চলে যায়। ডিএমপির তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের মধ্যে ওয়ারীতে সর্বোচ্চ ৩৪০ জন সক্রিয় রয়েছে। এরপরেই ২৪০ জন করে সক্রিয় তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে। মতিঝিলে সক্রিয় ১৬৮ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সঙ্গে ছিনতাইয়ের হটস্পটও নির্ধারণ করেছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এ তালিকায় মোহাম্মদপুর, পল্লবী, যাত্রাবাড়ী, দারুস সালাম, উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম, বিমানবন্দর, তেজগাঁও, কোতোয়ালি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শেরেবাংলানগর, আদাবর ও খিলক্ষেত অন্যতম। আর ঢাকার ৫০ থানা এলাকায় চার শতাধিক ছিনতাইয়ের হটস্পট রয়েছে। যেখানে গভীর রাত ও ভোরে ছিনতাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তবে তেজগাঁও ও ওয়ারী বিভাগ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার ও মামলাতে যেমন এগিয়ে, ছিনতাইয়ের হটস্পটেও শীর্ষে। ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাত মাসে রাজধানীতে দস্যুতার ঘটনায় ১১৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। কেননা, অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা বা জিডি করেন না। আবার ছিনতাই হলেও মামলা এড়াতে হারানোর জিডি করেন। ফলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।  

পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সিদ্ধান্ত : অপরাধ রোধে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বৈঠক করেছেন। থানা পুলিশের কর্মকা- নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশেষ বৈঠক করে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে সেখানকার কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি তাৎক্ষণিক বদলিসহ সাময়িক বরখাস্তও করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এলাকায় থানা পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন দায়িত্বে থাকারা।

এদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ড আগের চেয়ে বেশি তৎপর হচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধ ও টার্গেট কিলিং বাড়ছে। চরমপন্থিদেরও অপকর্মও বেড়ে গেছে। দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশ থেকে হত্যার নির্দেশনা আসছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও আছে আতঙ্ক। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার নির্দেশ দিলেও পুলিশের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে না লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র। ধরা পড়ছে না দাগি অপরাধী। প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রতিটি থানায় বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় পুুলিশের টহল বাড়াতেই হবে। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেই হবে। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত টহলেই থাকতে হবে। একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম। তিনি আরও বলেন, থানায় জনবল বা যানবাহন সংকট থাকলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল : গত শুক্রবার রাত ১২টার পর ও ভোরে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, গভীর রাতেও জমজমাট থাকে এই এলাকা। জনপথ মোড় থেকে যাত্রাবাড়ী চত্বরে আসা-যাওয়ার পথে অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ স্থানীয় দোকানিদের। দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা ভোরে টার্মিনালে নেমে হেঁটে বা রিকশাযোগে চত্বরের দিকে যান। আর তখনই সর্বস্ব লুটে নেয় ওঁৎ পেতে থাকা ছিনতাই চক্র। দিনের বেলায়ও প্রকাশ্যেই ওই স্থানে চলে ছিনতাই। তা সত্ত্বেও দেখা মেলেনি পুলিশের টহল টিমের। লঞ্চযোগে ভোরে সদরঘাট নেমে গন্তব্যে যান দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত পুলিশের দুটি টহল টিম দেখা গেছে। তবে মেইন সড়কের বাইরে বিশেষ করে বেড়িবাঁধ, মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা, চকবাজার হয়ে রিকশাযোগে গন্তব্যে যাওয়া মানুষকে ছিনতাইকারীর ভয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। এসব রুটে গভীর রাতে ও ভোরে পুলিশের টহল টিমই থাকে না।

গত রবিবার ভোর ৫টার দিকে কমলাপুর স্টেশনে কথা হয় বিটিসিএল-এ কর্মরত এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি জানান, মাসখানেক আগে রাজশাহী থেকে ভোরে কমলাপুর স্টেশনে এসে নামেন। অটোরিকশা নিয়ে মগবাজার বিটিসিএল কোয়ার্টারে যাওয়ার পথে অটোরিকশায় থাকা দুই যুবক তাকে অনুসরণ করে। সন্দেহ হওয়ায় তিনি পাশের গলির একটি রেস্টুরেন্টের সামনে থামেন। পেছনের রিকশাও সেখানে থামার প্রস্তুতি নেয়। তবে রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের দেখে আর থামেনি। এরপর থেকে তিনি স্টেশনে অপেক্ষা করেন, আলো ফোটার পর রওনা দেন। কমলাপুর থেকে মগবাজার বিটিসিএল কোয়ার্টার পর্যন্ত পথে কখনো পুলিশের টহল তার চোখে পড়েনি।

সড়কে থাকছে না পুলিশের উপস্থিতি : এর আগের দিন ভোরে মালিবাগ, মগবাজার, রেলগেট ও হাতিরঝিল এলাকায় ঘুরেও পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। অথচ তিন এলাকায় অটোরিকশাযোগে, বাইকে চেপে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে মাদকাসক্ত যুবকদের। দেখা যায়, শান্তিনগর থেকে মালিবাগ ফ্লাইওভারের নিচে ভাসমান অপরাধীদের আনাগোনা। যেন কোনো শিকারি খুঁজছে। একই চিত্র দেখা যায় সিরাজুল ইসলাম খান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীত পাশে সড়ক ডিভাইডারে। কয়েকজন সড়কে দাঁড়িয়ে দূর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। যেন রিকশাযোগে আসা যাত্রীদের টার্গেট করছেন। একটু এগিয়ে ওয়্যারলেস গেট বরাবর মগবাজারের দিকে যেতেই ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এলাকা। রোগী ও স্বজনদের ঘিরে রেললাইনের আশপাশে কয়েকটি ভাসমান দোকান ভোরের দিকেও খোলা থাকে। সেখানে অন্তত দুটি গ্রুপ দেখা যায়, যারা একত্রে আড্ডা দেন। দুজন অন্য অটোরিকশায় চড়ে মধুবাগের দিকে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর মধুবাগের দিক গিয়ে দেখা যায়, ওই দুই যুবককে বহনকারী রিকশা চেয়ারম্যান গলির মুখে। একজন রিকশার আড়ালে দাঁড়িয়ে, আরেকজন একপাশে দাঁড়িয়ে রাস্তার দুদিকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন।

গভীর রাতে ছিনতাইকারীদের আড্ডা : কারওয়ান বাজার (এফডিসি) সংলগ্ন হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি টার্মিনালের কিছুটা উত্তর পাশে ফাঁকা জায়গায় ভোরে আড্ডা দিতে দেখা যায় একদল যুবককে। ট্যাক্সি টার্মিনালের সিকিউরিটি গার্ডসহ কয়েকজন সতর্ক করেন ওদিকে না যেতে। তারা জানান, আড্ডা দেওয়া যুবকরা স্থানীয়, বস্তিতে বসবাস করে। রাত ১০টা বাজলেই তারা সেখানে জড়ো হয়ে মাদক সেবন করে। চলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। ভোরের দিকেও এদের উপদ্রব দেখতে পান স্থানীয়রা। কাউকে ফেলেই চাকু ঠেকিয়ে ছিনিয়ে নেয় সর্বস্ব। গ্রুপের কেউ কেউ কারওয়ান বাজার মাছের আড়তে কাজ করে, কেউ ভাসমান সবজি বিক্রেতা। নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হয়ে এমন অপকর্মে লিপ্ত হলেও সেখানে পুলিশের উপস্থিতি দেখেন না স্থানীয়রা। কারওয়ান বাজার রেলগেটে চলে মাদক বিক্রি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব জানা থাকলেও বেশ কয়েকদিন ঘুরেও সেখানে দেখা মেলেনি র‌্যাব-পুলিশের টহল টিম। প্রতিদিন ভোরে মাছ কিনতে কারওয়ান বাজার আসেন পাইকার সুমন শেখ। মাস দুয়েক আগে পান্থকুঞ্জ পার্ক সংলগ্ন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি। তিনি জানান, আসা-যাওয়ার পথে কখনো পুলিশের টহল চোখে পড়েনি। তার পরিচিত আরেক ব্যক্তিও এভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত