গুম-নিপীড়নের সংস্কৃতি ছিল ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে দমন করতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালার মাধ্যমে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ‘মাফিয়া শাসনামলে’ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গুম ও ভীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব মিজ অ্যান্ডা ফিলিপের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত সংসদ সদস্যদের মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন স্পিকার। এ সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

স্পিকার বলেন, টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা এবং ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে দেশে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় গুম ও নিপীড়নের আবহ তৈরি করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে স্পিকার বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মানুষ আর কখনো এ ধরনের গুম ও নিপীড়নের সংস্কৃতির শিকার হয়নি।

গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এমপিরা : মতবিনিময় সভায় রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার সংসদ সদস্যরা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা গুম, বন্দিত্ব, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিভিন্ন ঘটনা আইপিইউ মহাসচিবের সামনে তুলে ধরেন। সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের দীর্ঘদিনের গুমের মর্মস্পর্শী ঘটনা তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা স্বজনকে ঘিরে পরিবারের অপেক্ষা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার চিত্র উঠে আসে।

এ সময় ‘নিপীড়ন থেকে বিপ্লব : রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন উন্মোচন’ শীর্ষক ডকুমেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর বিগত শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক গুম, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়।

সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান আয়নাঘরে বন্দিজীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি গুম ও নিপীড়নের সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন।

সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তার স্বামী ইলিয়াস আলীকে গুম করার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘গুম’ শব্দটি প্রথম ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গুমকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিচারবহির্ভূত এসব গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

চউশেস্কুর শাসনের সঙ্গে মিল রয়েছে : আইপিইউ মহাসচিব মিজ অ্যান্ডা ফিলিপ বলেন, বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং বিরোধী মতাদর্শের অনুসারীদের ওপর নিপীড়ন অমানবিক ও জঘন্য। তিনি বলেন, তার নিজ দেশ রোমানিয়ায় নিকোলায়ে চউশেস্কুর নির্মম দমননীতির সঙ্গে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধানের শাসনামলের মিল রয়েছে। বাংলাদেশ সফর শেষে আইপিইউর গভর্নিং বডির কাছে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানান তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত