রাজশাহীর হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেই তরল চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত তরল চিকিৎসা বর্জ্য সরাসরি নগরীর ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, জেলায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটিতে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বা বর্জ্য শোধনাগার রয়েছে। অর্থাৎ ২১৪ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই তরল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
রাজশাহী নগরীর হাসপাতালপাড়া হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল পদার্থ, রাসায়নিক পদার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের জীবাণুযুক্ত উপাদান। নিয়মানুযায়ী, এসব তরল বর্জ্য শোধন করে নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত শোধনব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পয়োনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে বাইরে ফেলছে।
নগরীর বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রায় সবকটিরই তরল বর্জ্য ড্রেনে ফেলা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ড্রেন ও নালার মাধ্যমে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে পবা এলাকায়। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ড্রেনের পানি বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে নগরীর ড্রেনের বর্জ্যও শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। একই সঙ্গে এসব বর্জ্যে থাকা জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান মানুষের সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
পবা উপজেলার বাসিন্দা আবদুস সালাম বলেন, ‘এলাকার ড্রেনে প্রায়ই মেডিকেল বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। ড্রেনের পানিতে রক্ত, তুলা, গজসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে থাকে। এসব বর্জ্যরে কারণে প্রচ- দুর্গন্ধ ছড়ায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই পানিতে নামতে হয়। তখন সিরিঞ্জ, তার ও কাচের বোতলের মতো বর্জ্য পায়ে লেগে কেটে যায়। পরে চুলকানি ও ঘা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, ‘ড্রেনের পানি অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। পানিতে নামলে বা পা ভিজলে পরে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। অনেক সময় পায়ে ছোট ছোট ঘা হয়ে যায়। ড্রেনে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।’
স্থানীয়দের দাবি, রাজশাহীর প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এসব শোধনাগার নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যরে তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। অপরিশোধিত অবস্থায় তা ড্রেনে বা পরিবেশে গেলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তা ছাড়া জলাশয় ও নদীর পানির জীববৈচিত্র্যের জন্যও এসব বর্জ্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালের তরল বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে গেলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।’
ক্লিনিক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য শোধনের ব্যসস্থা না থাকায় পয়োনিষ্কাশন লাইনের মাধ্যমে তারা তরল বর্জ্য অপসারণ করেন। তবে এভাবে অপরিশোধিত বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নগরীর ড্রেন ও নালায় কিংবা শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়ছে কি না, তা তাদের জানা নেই। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি জানান, বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে তারপর পয়োনিষ্কাশন লাইনে দেন। তবে সরকার যদি এটি পুরোপুরি পরিশোধন করতে বলে, সে ক্ষেত্রে তারা তা মেনে চলবেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকি। এখানে চাইলেই তো আর ইটিপি বসাতে পারি না। তবে আমাদের সময় দিলে আমরা ইটিপি বসাব।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজশাহীতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, ‘পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা এগুলো না মানলে আমরা অভিযান পরিচালনা করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছরে তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই তারা এগুলো নির্মাণ করবে।’
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।