১৫ দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে: প্রতিমন্ত্রী

 গত দেড় দশকে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। 

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় বিপর্যয়ের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার তাৎক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জনগণের এই সাময়িক দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কারিগরি সমস্যা সমাধান ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

গ্যাস সংকটে কমছে উৎপাদন

সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এ সক্ষমতা কাজে লাগাতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় সব গ্যাস সরবরাহ করলে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাসের ঘাটতি আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে।

পায়রা-মাতারবাড়ীর দুটি ইউনিট বন্ধ

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটিও বড় কারণ বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এগুলো দ্রুত চালুর জন্য কাজ চলছে।

আদানির সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ এবং রাতে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া গত ২১ জুলাই এলএনজি সরবরাহের দুটি এফএসআরইউর একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। পরে ১৫ আগস্ট সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে পুরো সরবরাহব্যবস্থা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমানে সংকটের ৮৮ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।

ফার্নেস অয়েল থেকে বাড়ছে উৎপাদন

বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েল বা এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হলেও বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পুঞ্জীভূত বকেয়া পাওনা প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংকট মোকাবিলায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দ্রুত এগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

রুফটপ সোলারে জোর

বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে রুফটপ সোলার বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। আগামী গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুম সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে রুফটপ সোলার স্থাপনকারীরা উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ তিন বছর পর্যন্ত সরকারকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করতে পারবেন। এতে বিনিয়োগকারীরা তিন বছরের মধ্যে বিনিয়োগের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এ ছাড়া সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও ভোল্টেজ রেগুলেটরসহ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম আমদানিতে আগামী ছয় মাসের জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হয়েছে। আমদানিকারকদের শুধু ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে বলে জানান তিনি।

‘দেড় দশকের ভুল নীতির মাশুল’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের নীতির সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশকে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি।

জ্বালানি আমদানিতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণেও বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটে জনগণের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি রাত ৮টার পর বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত