গণশুনানিতেই হুইলচেয়ার কিনে দিলেন মানবিক ডিসি জাহিদ

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

চার বছর আগে একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে কুরবান আলীর স্বাভাবিক জীবন। দুই হাত, দুই পা—চারটি অঙ্গই অচল। একসময় ট্রাকের হেলপার হিসেবে নিজের শ্রমে সংসার চালানো মানুষটি এখন চলাফেরার জন্যও অন্যের ওপর নির্ভরশীল। স্ত্রী আর একমাত্র মেয়েটি ছাড়া পাশে দাঁড়ানোরও কেউ নেই।

কুরবানের চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার। যাতে অন্তত নিজের ইচ্ছায় একটু চলতে পারেন।

সেই আশা নিয়েই বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হয়েছিলেন মো. কুরবান আলী।

কুরবানের দুর্দশার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এরপর শুধু আশ্বাস দিয়ে অপেক্ষায় রাখেননি। গণশুনানি চলাকালেই একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার কিনে এনে কুরবানের হাতে তুলে দেন। পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক সহায়তাও দেন।

কুরবান একসময় ট্রাকের হেলপার ছিলেন। দৈনিক মজুরির টাকায় চলত স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। প্রায় চার বছর আগে একটি ট্রাক দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দেয়।

দুর্ঘটনায় তাঁর দুই হাত ও দুই পা অচল হয়ে যায়। যে মানুষটি নিজের শ্রমে পরিবার চালাতেন, সেই মানুষটিই এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। তাঁকে দেখাশোনার জন্য স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান ছাড়া আর কেউ নেই।

কর্মক্ষমতা হারানোর সঙ্গে হারিয়ে যায় আয়ের পথও। দীর্ঘ চার বছরের অসহায় জীবনে কুরবানের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার। সেই প্রয়োজনের কথা জানাতেই তিনি জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে আসেন।

ট্রাকের হেলপার হিসেবে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। দুর্ঘটনায় চার অঙ্গ অচল হওয়ার পর একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। স্বাভাবিক চলাফেরার জন্য একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার তাঁর একান্ত প্রয়োজন।

তাঁর আবেদনটি শোনার পর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা তাৎক্ষণিকভাবে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। গণশুনানি শেষ হওয়ার অপেক্ষাও করতে হয়নি কুরবানকে। শুনানি চলাকালেই কিনে আনা হয় ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার। সেটি কুরবানের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে  আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

যে মানুষটি একটি হুইলচেয়ারের আশায় জেলা প্রশাসনের দরজায় এসেছিলেন, তাঁকে সেই হুইলচেয়ার তাৎক্ষণিকভাবে দিলেন সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।

কুরবানের মতো আরও কয়েকজন অসহায় মানুষ এদিন নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে গণশুনানিতে হাজির হন।

হাটহাজারীর তানভীর হাসান এসেছিলেন ক্যান্সারে আক্রান্ত মা রুবি আক্তারের চিকিৎসার জন্য। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিসিটিভি অপারেটর হিসেবে কর্মরত তানভীরের সীমিত আয়ে মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর কথা শুনে জেলা প্রশাসক পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেন।

বাঁশখালীর মো. সেলিম উদ্দীন এসেছিলেন জন্ম থেকে শারীরিক জটিলতা ও দৃষ্টিহীনতায় ভোগা ছেলে মো. শাহরিয়ার আদনানের জন্য। চিকিৎসকের পরামর্শে ছেলেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নিতে চান তিনি। এতে সাত থেকে আট লাখ টাকা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন সেলিম। তাঁর আবেদন মানবিক বিবেচনায় আর্থিক সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হয়।

মিরসরাইয়ের আবদুল্লাহ আল ফয়সাল চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইলে তাঁকে দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। একইভাবে প্রায় ২৭ বছর ধরে প্যারালাইসিস, মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের জটিল রোগে ভোগা নগরের ইপিজেড এলাকার মো. মুজিবুল আলমকে দুই হাজার টাকা সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান পা অচল হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া জিইসি এলাকার মো. ইউছুফও এসেছিলেন চিকিৎসার টাকা চাইতে। তাঁর দুর্দশার কথা শুনে তাঁকেও দুই হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

কুরবান এসেছিলেন একটি হুইলচেয়ারের আশায়। তানভীর এসেছিলেন ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের জন্য। সেলিম এসেছিলেন সন্তানের চোখের চিকিৎসার স্বপ্ন নিয়ে। মুজিবুল এসেছিলেন ২৭ বছরের রোগযন্ত্রণা নিয়ে। আর ইউছুফ এসেছিলেন দুর্ঘটনায় থমকে যাওয়া জীবন নিয়ে।

তাঁদের সংকট আলাদা, কিন্তু প্রত্যাশা ছিল এক—কেউ তাঁদের কথা শুনুক, বিপদের দিনে রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াক।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা তাঁদের কথা শুনেছেন। শুধু আবেদন গ্রহণ করে ফাইলে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি; প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বিশেষ করে কুরবানের ঘটনাটি যেন এদিনের গণশুনানির মানবিক ছবিটিই তুলে ধরে। চার অঙ্গ অচল একজন মানুষ দূর থেকে এসেছিলেন একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারের আবেদন নিয়ে। তাঁকে নতুন কোনো তারিখ দিয়ে ফিরে যেতে হয়নি। গণশুনানি চলাকালেই হুইলচেয়ার কিনে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

একটি হুইলচেয়ার কুরবানের অচল হাত-পা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু অন্যের ওপর তাঁর নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমাতে পারে। কয়েক হাজার টাকার সহায়তাও হয়তো একটি পরিবারের দীর্ঘ চিকিৎসার পুরো ব্যয় মেটাবে না, তবে অসহায় মুহূর্তে রাষ্ট্র পাশে আছে—সেই ভরসাটুকু দিতে পারে।

অসহায় মানুষের কথা শোনা এবং সম্ভব হলে অপেক্ষায় না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর এমন উদ্যোগই চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে মানুষের কাছে তুলে ধরছে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত