সময়োপযোগী নীতি-ঘাটতি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ এএম

আমাদের দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে বলতে গেলে কিছু বিষয় সামনে আসে। যেমন হাসপাতালে শয্যা নেই, ডাক্তার কম, ওষুধের দাম বেশি, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা ব্যয়বহুল, কিংবা সরকারি হাসপাতালে সেবার মান ভালো নয়। এসব সমস্যার পেছনে থাকা আরও মৌলিক একটি বিষয় নিয়ে আমরা তুলনামূলকভাবে কম কথা বলি এবং সেটা হলো স্বাস্থ্যনীতি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্যনীতি কতটা সময়োপযোগী? বাংলাদেশের একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি রয়েছে। সেটি প্রণীত হয়েছিল ২০১১ সালে। সেখানে সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবায় সমতা আনা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা এবং স্বাস্থ্য খাতে জনবল গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল। নীতি হিসেবে এগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় দেড় দশক পার হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে দেশের জনসংখ্যা, রোগের ধরন, চিকিৎসার ব্যয়, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের স্বাস্থ্যসেবা চাহিদায় বড় পরিবর্তন এসেছে। করোনা মহামারী আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নতুন দুর্বলতাও দেখিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ডেঙ্গুর বিস্তার, জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অসংক্রামক রোগের চাপ এখন আগের তুলনায় অনেক বড় উদ্বেগ। নীতিটি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন লক্ষ্যগুলো অপূর্ণ রয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় সেটি কতটা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যু কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে এবং টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু দেশের রোগের ধরন দ্রুত বদলেছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘমেয়াদি শ^াসতন্ত্রের রোগের বোঝা বেড়েছে। চিকিৎসার খরচের বোঝা মানুষের ওপর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক হিসাবে, বাংলাদেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকের মান ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৫৪। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয়ের কারণে প্রায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ আর্থিক চাপের মুখে পড়েন, যা প্রায় সাত কোটি মানুষের সমান। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়া, জমি বা সম্পদ বিক্রি, ধারদেনা এবং চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মর্মস্পর্শী গল্প। কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুটি কাজ জরুরি, যথা মানুষকে সুস্থ রাখা ও অসুস্থতার কারণে দরিদ্র হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা এখনো অনেকাংশে হাসপাতালকেন্দ্রিক। নতুন হাসপাতাল, নতুন মেডিকেল কলেজ, নতুন যন্ত্রপাতি। হাসপাতাল বাড়িয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব সমস্যার সমাধান করা অনেকটা আগুন লাগার পর দমকলের গাড়ি কেনার মতো। আমাদের জানতে হবে, কোন বয়সের মানুষের কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন? কোন অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীতে রোগের বোঝা বেশি, কোন কাজটি চিকিৎসককে করতে হবে, আর কোন সেবা নার্স, থেরাপিস্ট, প্রযুক্তিবিদ বা প্রশিক্ষিত অন্য স্বাস্থ্যকর্মী দিতে পারেন ইত্যাদি। অর্থাৎ জনবল পরিকল্পনা শুধু মাথা গোনার বিষয় নয়। বাংলাদেশে এখন বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্যতথ্য তৈরি হচ্ছে। জাতীয় জরিপ, হাসপাতালের তথ্য, রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, জনমিতির উপাত্ত এবং বিভিন্ন গবেষণা থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তথ্য সংগ্রহের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই তথ্য নীতিনির্ধারণে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে? কোন কর্মসূচিতে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে কতজন মানুষ উপকৃত হবেন ইত্যাদি। দেশের বাজেট কি দীর্ঘ মেয়াদে সেই কর্মসূচি চালিয়ে যেতে পারবে? সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ধারণাটি সহজ। একজন মানুষ প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন, কিন্তু সেই সেবার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়বেন না। বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩৫ সময়কালের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার একটি নকশা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি পর্যালোচনা করে একটি সময়োপযোগী স্বাস্থ্যনীতি তৈরি জরুরি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে পরবর্তী পর্যায়ে নিতে হলে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। অর্থ কোথায়, কেন এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, সীমিত সম্পদ নিয়েও জনস্বাস্থ্যে বড় অর্জন সম্ভব। এখন চ্যালেঞ্জটি ভিন্ন এবং আরও জটিল। আগামী দিনের প্রশ্ন শুধু ‘আরও কতটি হাসপাতাল প্রয়োজন তা নয়। কী ধরনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুললে একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই সুরক্ষা পাবেন, অসুস্থ হলে সময়মতো মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন এবং সেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে যাবেন না তা থাকুক জিজ্ঞাসায়। এই প্রশ্নের পরিকল্পিত, প্রমাণভিত্তিক এবং ন্যায়সংগত উত্তর হলো স্বাস্থ্যনীতি।

লেখক : হেলথ সার্ভিস রিসার্চ ফেলো ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক, আয়ারল্যান্ড

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত