দখলে থমকে আছে মেগা প্রকল্প

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

অবৈধ দখলদারদের দাপট এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) জলাবদ্ধতা নিরসনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে থমকে আছে লবনচরায় পাম্প হাউজ নির্মাণকাজ। পাশাপাশি, সংস্কারের অভাবে লবনচরা ২ নম্বর স্লুইসগেট ও আলুতলা ১০ কপাট স্লুইসগেটের (১০ গেট) পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত জমি অবৈধভাবে দখলদারদের নামে রেকর্ডভুক্ত হওয়ায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।  

কেসিসি সূত্র জানায়, জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কঋড)-এর অর্থায়নে খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতি মোকাবিলায় খুলনা শহরের উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প হাউজ ও স্লুইসগেটসহ তিনটি প্রকল্প হাতে নেয় কেসিসি। কিন্তু ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা ও অবৈধ দখলের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ এখন ভেস্তে যাচ্ছে।

সেই লক্ষে কেসিসি ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের লবনচরা ২ নম্বর স্লুইসগেট ও পাম্প হাউজ প্রকল্প এবং আলুতলায় ১০ কপাট স্লুইসগেট আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেয়। এজন্য গত বছর ২৯ নভেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কেসিসির সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড লবনচরা মৌজার ২ একর জমি কেসিসিকে হস্তান্তর করলেও, স্লুইসগেট ও পাম্প হাউজ নির্মাণের জন্য সেই জমি এখনো দখলমুক্ত করতে পারেনি কেসিসি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, যৌথ সার্ভেয়ারের মাধ্যমে মৌজা ম্যাপ পরতাল করে দেখা যায় নদী শ্রেণিভুক্ত এই জমির নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। লবনচরা অধিগ্রহণকৃত ২ একর জমির আংশিক পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে রেকর্ড হয়েছে, অবশিষ্ট জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে কেসিসি এই জমির আর এস রেকর্ড সংশোধনের জন্য চলতি বছরের ৮ জুলাই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দেয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই জমি উদ্ধারের জন্য পনি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে খুলনা সিটি করপোরেশন কর্তৃক গৃহীত ‘জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত ক্ষতি মোকাবিলায় খুলনা শহরের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে সøুইসগেট ও পাম্প হাউজ নির্মণকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান কেন্দ্র আলুতলার ১০ কপাট স্লুইসগেট সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে কেসিসি। এটি বর্ষায় শহরের অতিরিক্ত পানি রূপসা নদীতে নিষ্কাশন করে এবং জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ আটকায়। তবে ভূমি মালিকদের আপত্তি ও আইনি জটিলতায় এই গেট ও বাঁধের স্থায়ী সংস্কার থমকে আছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘লবনচরা এবং তেঁতুলতলা মৌজার আলুতলায় ২০ দশমিক ২৯ একর জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত। এই জমি কীভাবে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডর্ভুক্ত হয় তা আমাদের জানা নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের (এসি ল্যান্ড) মাধ্যমে অধিগ্রহণকৃত জমি অবৈধভাবে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডভুক্ত করেছে।’

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কেসিসির মধ্যে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে যে জমি হস্তান্তর করা হয় তা ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডভুক্ত হওয়ার কথা নয়। বিআরএস জরীপে যেসব জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে আইনগতভাবে আমরা সেই জমি উদ্ধারের তৎপরতা চালাচ্ছি।

বটিয়াঘাটা উপজেলা সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. শোয়েব শাত ঈল ইভান বলেন, এস এ দাগের ভিপি কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি বিআরএস দাগে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডভুক্ত হওয়ার ঘটনা যাচাই না করে বলা যাবে না।

প্রকল্প পরিচালক খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী আবির-উল-জব্বার বলেন, খুলনা শহরের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে লবনচরা ২ নম্বর স্লুইসগেট ও পাম্প হাউজ নির্মাণকাজ জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় থমকে আছে। অভ্যন্তরীণ জমে থাকা পানি পাম্প করে নদীতে নিষ্কাশনের জন্য এই প্রকল্পগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এই জমির আরএসরেকর্ড সংশোধনের জন্য চিঠি দিয়েছি। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প হাউজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, চার দশক ধরে খুলনা নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। সামান্য বৃষ্টিতেই খুলনা শহরের অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে যায়।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘জলাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এর স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন। জলাবদ্ধতার জন্য ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা দায়ী। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য লবনচরা সøুইসগেট, পাম্প হাউজ ও আলুতলা ১০ গেট প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত নগরবাসীকে অপেক্ষা করতে হবে।’ 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত