আমলের আগে জ্ঞান জরুরি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদত করার জন্য। এজন্য তিনি নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন এবং কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান করা এবং সেই ইবাদতের পদ্ধতি তাদের কাছে বর্ণনা ও স্পষ্ট করে দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য। আমি তাদের কাছে কোনো রিজিক চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে আহার করাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, প্রবল শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬-৫৮)

যথাযথভাবে এই ইবাদত পালনের একমাত্র উপায় হলো মহান আল্লাহর সাহায্য, অতঃপর দ্বীনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জ্ঞানই আমলের ভিত্তি। তাই আমলের আগে জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক, যাতে আমল সুস্পষ্ট শরিয়তের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সঠিক হেদায়াতের আলোকে সম্পাদিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ (সুরা মুহাম্মদ ১৯)

এ আয়াতে মহান আল্লাহ প্রথমে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘জেনে রাখো’ বলে। এরপর আমলের কথা বলেছেন, ‘গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো’ বলে। কারণ ক্ষমা প্রার্থনা এমন একটি আমল, যার সঠিক পদ্ধতি জ্ঞান দ্বারা জানা যায় এবং জ্ঞানই মানুষকে সেই আমলের প্রতি নির্দেশিত করে।

এ আয়াত জ্ঞানের মর্যাদা ও গুরুত্বও স্পষ্ট করে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ মহান আল্লাহকে চিনতে পারে। আল্লাহ যে কিতাব ও হেকমত অবতীর্ণ করেছেন, সেটার প্রতি ইমান দৃঢ় হয়। একই সঙ্গে অন্তরে আল্লাহর ভয় এবং তার প্রতি গভীর আনুগত্য সৃষ্টি হয়। আর আল্লাহভীতি এমন এক মহৎ সম্পদ, যার জন্য প্রতিযোগিতাকারীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত এবং মুমিনদের পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা করা উচিত।

তাই জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ)

একজন মুসলিমের জন্য দ্বীনের যেসব বিষয় জানা অপরিহার্য, সেগুলো তাকে শিখতে হবে। যেমন আকিদা, পবিত্রতা, নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজের বিধান। যাতে সে সঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে।

একইভাবে একজন মুসলিম যে কাজ বা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরিয়তের বিধানও তার জানা আবশ্যক। একজন ব্যবসায়ীকে ব্যবসার বিধান জানতে হবে। একজন চিকিৎসককে তার পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধান জানতে হবে। একজন প্রকৌশলীকেও তার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত ইসলামের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এভাবে প্রত্যেক পেশাজীবীর জন্য নিজের পেশা ও দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধান জানা প্রয়োজন। যাতে সে অজ্ঞতাবশত হারামে লিপ্ত না হয়। বরং জ্ঞানের মাধ্যমে যেন সে সঠিক পথে চলতে পারে এবং জাতি ও দেশের মানুষকে এই মহান দ্বীনের পথে পরিচালিত করতে পারে।

ইসলাম আল্লাহভীরু আলেমদের এমন মর্যাদা প্রদান করেছে, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাদের জন্য রেখেছে এমন বিশাল ফজিলত, যার পরিধি সীমাহীন। তারা বিশ্বস্ত, মহান আল্লাহ তাদের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, তাদের অবস্থান উঁচু করেছেন এবং নিজের অশেষ অনুগ্রহের ভাণ্ডার থেকে তাদের ওপর দয়া বর্ষণ করেছেন।

মহান আল্লাহ সাত আসমানের ওপর থেকে তার তাওহিদ বা একত্ববাদের সবচেয়ে বড় সাক্ষ্যে তাদের সাক্ষী বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতা ও জ্ঞানীরাও ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে এ সাক্ষ্য দিয় যে, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮)

আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের চোখের শীতলতা। তাদের জ্ঞান ও মর্যাদার কারণে মানুষ তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়। তারা অন্ধকারের প্রদীপ, হেদায়াতের ইমাম এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রমাণ। তাদের মাধ্যমে চিন্তা ও বিশ্বাসের ভ্রান্তি দূর হয়। তাদের মাধ্যমে অন্তর ও আত্মা থেকে সন্দেহের মেঘ সরে যায়। তারা শয়তানের ক্ষোভের কারণ, ইমানের স্তম্ভ এবং জাতির মেরুদণ্ড।

তারা দ্বীন ও জ্ঞানকে এমন সব বিকৃতি থেকে রক্ষা করেন, যা সীমালঙ্ঘনকারীরা সৃষ্টি করে। মিথ্যাবাদীরা যে বিষয় নিজেদের পক্ষ থেকে সংযোজন করে, তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। অজ্ঞরা যে ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, তারা তা সংশোধন করেন।

কেউ যদি কোনো আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যায় বাড়াবাড়ি করে এবং এমন কোনো সংশয় বা উপাদান নিয়ে আসে, যা সঠিক বোঝাপড়া থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, আলেমরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। যাতে দ্বীন সব ধরনের বিকৃতি ও সংশয় থেকে পবিত্র থাকে।

এ কারণেই পৃথিবীবাসীর জন্য আলেমরা মহান আল্লাহর অন্যতম বড় নেয়ামত। তাই আমাদের কর্তব্য হলো, তাদের সম্মান করা এবং জ্ঞান প্রচার ও মানুষকে উপকৃত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ সেই সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।’ (সুরা মুজাদালাহ ১১)

উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বড়দের সম্মান করে না, আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের আলেমের অধিকার সম্পর্কে অবগত নয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসনাদে আহমদ)

জ্ঞান ও জ্ঞানীদের মর্যাদার জন্য এটিই যথেষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন। ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষণকারীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন। আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীরা, এমনকি পানির মাছ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। একজন আলেমের মর্যাদা একজন ইবাদতকারীর ওপর এমন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদের মর্যাদা অন্যান্য নক্ষত্রের ওপর। আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা কোনো দিনার বা দিরহাম উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাননি, তারা রেখে গেছেন জ্ঞান। যে ব্যক্তি সেই জ্ঞান গ্রহণ করেছে, সে বিপুল অংশ লাভ করেছে।’ (আবু দাউদ ৩৬৪১)

এসব মর্যাদা সেসব আমলদার ও কল্যাণকামী আলেমের জন্য, যারা মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.), মুসলিমদের নেতা এবং সাধারণ মুসলিমদের কল্যাণের প্রতি আন্তরিক।

শিক্ষাবর্ষের সূচনালগ্নে মানুষের আশা নতুন করে জাগে। জ্ঞান ও শিক্ষার পথচলা আবার শুরু হয়। আর তখন জাতির উন্নতি ও সমাজের অগ্রগতিতে জ্ঞানের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাশক্তি আলোকিত হয়, সভ্যতা গড়ে ওঠে, সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ে এবং এমন জ্ঞান ও উপকারী বিদ্যা অর্জিত হয়, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কল্যাণ ও সংশোধন বয়ে আনে।

এই জ্ঞান ও শিক্ষার পথচলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের দায়িত্ব। কারণ তারা শিক্ষা ও গড়ে তোলার আমানত বহন করেন। তারা নতুন প্রজন্মের ব্যক্তিত্বকে জ্ঞান, চিন্তা ও আচরণের দিক থেকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাই তাদের উচিত নিষ্ঠা ও আমানতের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা। তাদের উপলব্ধি করা উচিত, শিক্ষার্থীদের অন্তরে তাদের প্রভাব কতটা গভীর। একই সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও প্রতিপালনের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। শুধু জ্ঞান পৌঁছে দিলেই হবে না, সেই জ্ঞানের সঙ্গে মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে।

একইভাবে শিক্ষার এই পথচলা সফল করার ক্ষেত্রে পরিবারেরও মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারই সেই প্রথম পরিবেশ, যেখানে ছেলেমেয়েরা দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা লাভ করে। বাড়িতে সত্যবাদিতা, মানুষের সঙ্গে আচরণে দয়া, নামাজের প্রতি যতœশীলতা এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসই হলো প্রকৃত শিক্ষা।

২৮ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত