দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আবারও বাড়ল। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এখন শ্রেণিকৃত।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তখন মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল শ্রেণিকৃত। ফলে তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা এবং হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় এক বছরের হিসাব দেখলে। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঘরে। এর পরের এক বছরে তা বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা এক লাফে প্রায় ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় ওঠে। পরে পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার কারণে ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নেমে আসে।
আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি মূলত দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ যাচাই, প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা এবং সময়মতো ঋণ আদায় না করার ফল বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
২০২৩ সালের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। একই বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে তা ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা এবং জুনে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ মাত্র দেড়-দুই বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের হিসাবের বাইরে থাকা প্রকৃত দুর্বল ঋণ এখন শ্রেণিকরণ করা হচ্ছে। ফলে পরিসংখ্যানে হঠাৎ বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক হেলাল আহমেদ খান জনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ শুধু আর্থিক খাতের সমস্যা নয়; এটি সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মধ্যকার দুর্বল ব্যবস্থারও প্রতিফলন। তার মতে, খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ দুর্বল হওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির সংকেত। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের লুকানো ঋণ প্রকাশ্যে আসার বিষয়টিকেও ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ। কারণ প্রকৃত ঋণমান প্রকাশ না করলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।
খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ওপর প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূলধন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের ঘাটতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। ওই সময় প্রয়োজনীয় প্রভিশনের মাত্র ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ সংরক্ষণ করতে পেরেছিল ব্যাংকগুলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণের বড় অংশ যদি আদায় করা না যায়, তাহলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু পুনঃতফসিল বা নীতিগত ছাড় দিয়ে কাজ হবে না। প্রকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে ঋণ আদায়, জালিয়াতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে বিশেষ এক্সিট সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গত জুনে মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ানো খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকগুলোর হিসাবের সমস্যা নয়; এটি দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আমানতকারীদের আস্থা ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।