কচুরিপানায় ডুবছে কৃষি

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ এএম

বর্ষা মৌসুমে চলনবিল যেখানে পানিতে থইথই করার কথা, নৌকা চলাচল আর মাছ ধরার ধুম পড়ার কথাÑ সেখানে এখন শুধুই কচুরিপানার বিস্তীর্ণ সবুজ জটলা। দূর থেকে এই সবুজ দেখতে সুন্দর লাগলেও, বাস্তবে এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে বড় সংকট। পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, কমছে দেশীয় মাছের প্রজনন এবং সংকুচিত হচ্ছে নদীনালা। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের মূল চালিকাশক্তি চলনবিল এখন তার চিরচেনা রূপ হারাতে বসেছে।

নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ বিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদী ও খালের মুখ কচুরিপানায় আটকে থাকায় পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় আসন্ন রবিশস্যের আবাদ নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয় চাষিরা। কৃষকরা জানান, সময়মতো পানি না কমলে সরিষা, গম ও ইরি-বোরো চাষ পিছিয়ে যাবে। পাশাপাশি জমি থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে বিপুল পরিমাণ বাড়তি টাকা খরচ হবে। বিলপাড়ের কৃষক ফারুক হোসেন, ময়েজ উদ্দিন ও হাসান আলীর মতে, প্রতি বিঘা জমি থেকে কচুরিপানা সরাতে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ব্যয় হবে। পানি নামতে দেরি হলে জমি প্রস্তুত করা যাবে না, যার ফলে পুরো মৌসুমের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

নদী-খাল ভরাট, থেমে যাচ্ছে পানির পথ : কৃষি ও মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিলের সমস্যা শুধু কচুরিপানা নয়। অপরিকল্পিত সড়ক, বসতবাড়ি, বাঁধ, পুকুর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বহু জায়গায় সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানীসহ বিলের সঙ্গে যুক্ত নদী ও নালাগুলো দীর্ঘদিন যথাযথভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় পলি জমে নাব্য কমেছে। বর্ষায় উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা এসব বাধার মুখে ভাটিতে যেতে না পেরে বিল ও নদীর বিভিন্ন অংশে আটকে থাকে। অবৈধ সোঁতিজাল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিল অঞ্চলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১০ কিলোমিটার। এর বড় অংশ পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। একসময় এসব খাল-নালা থেকে হাজার হাজার কৃষক সেচের পানি পেতেন। এখন অনেক এলাকায় সেই সুবিধা আর নেই।

কমছে প্রাকৃতিক মাছ : চলনবিলের সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে মৎস্য সম্পদের। নদী-খাল ভরাট, পানির গভীরতা কমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, কচুরিপানার বিস্তার, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক মাছের আবাস ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।

নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, সংযুক্ত নালা-খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ প্রাকৃতিক মাছের জন্য বড় হুমকি। মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ধরে রাখতে হলে নালা-খাল পুনঃখনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মৎস্য আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি।

ছোট হচ্ছে চলনবিল : চলনবিল শুধু একটি বিল নয়; এটি পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জজুড়ে বিস্তৃত বিশাল জলাভূমি ব্যবস্থা। একসময় এর বিস্তার ছিল আরও বড়। সময়ের সঙ্গে দখল, পলি জমা, অবকাঠামো নির্মাণ ও পানিপ্রবাহের পরিবর্তনে এর আয়তন উল্লেখযোগ্য কমেছে। চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, রেললাইন, মহাসড়ক, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সøুইসগেট এবং বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বহু জায়গায় প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের ধারাকে বদলে দিয়েছে। ফলে একদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দুই ধরনের সমস্যাই এখন দৃশ্যমান।

ভূগর্ভস্থ পানিতেও বাড়ছে চাপ : বর্ষায় বিলের এক অংশ কচুরিপানা ও জলাবদ্ধতায় ভোগে, আবার মার্চ-এপ্রিল এলেই দেখা দেয় উল্টো চিত্র। নদী ও খাল শুকিয়ে গেলে বোরো আবাদের জন্য কৃষকদের নির্ভর করতে হয় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। অনেক এলাকায় পানি পেতে সেচযন্ত্র বসানোর জন্য মাটি আরও গভীর পর্যন্ত খুঁড়তে হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-উপরিস্থ পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা দুর্বল হলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাত হোসেন বলেন, নদী-নালা ও খালে পলি জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে কৃষি ও মৎস্য উভয় ক্ষেত্রেই।

সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি : চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে চলনবিল রক্ষা সম্ভব নয়। পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও ভূমিসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধ, প্রয়োজনীয় খাল পুনঃখনন এবং পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান নাজলি পারভিন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে চলনবিলের আবহাওয়া ও পরিবেশগত ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। তার মতে, বিলকে বাঁচাতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি। চলনবিলের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার নয়; প্রয়োজন নদী-খাল পুনরুদ্ধার, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা। নইলে একদিন হয়তো চলনবিল থাকবে মানচিত্রে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার জল, মাছ, কৃষি আর চিরচেনা জীবন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত