জাতিসংঘ সম্মেলনে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির বার্তা দিন

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ এএম

আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলনে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশে পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক সংস্কার পরিস্থিতির বার্তা তুলে ধরে বিদেশিসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর জোর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে উৎপাদনশীল, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটন সেবা শিল্পে কাজে লাগাতেও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিতে সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) ও মাল্টিমডাল (বহুমাত্রিক) যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা যেমন সমুদ্র ও স্থলবন্দর এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা উচ্চমানের হাইওয়ে ব্যবহারের সম্ভাবনাও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে।

গতকাল শনিবার ঢাকার একটি হোটেল ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি (এনআরবি সেন্টার) নামে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি ফোরাম এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

উল্লেখ্য, আসন্ন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। সাধারণ পরিষদে মূল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। এবারের সভায় নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতিত্ব করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় দেশের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন।

সভায় বক্তারা বলেন, সরকারকে এমন একটি পরিবেশ তৈরির কথা বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে; যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও স্বাচ্ছন্দ্যে দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের মতে, এই মুহূর্তে জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের গৃহীত পথনকশা তুলে ধরে আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনার জানান দিতে হবে। বক্তারা বলেন, বিশ্বে এই ধারণা দিতে হবে যে, সরকার ব্যাংকিং খাতসহ নানা বিভাগ ও দপ্তরকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের বিভিন্ন খাতে গুণগত পরিবর্তন আনতেও চেষ্টা চলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। আমি ইউএনডিপি সদর দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জাতিসংঘ সম্মেলনে এবার বাংলাদেশ সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিদেশিরা আমাদের দেশের অনেক ইতিবাচক বিষয় নিয়ে তাদের আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের পাটশিল্প, পোশাকশিল্প, ওষুধ ও বিপুল জনগোষ্ঠী। তারা জানে আমাদের কর্মক্ষম বিপুল শ্রমশক্তি রয়েছে। বিদেশে আমাদের এই ইতিবাচক ধারণাসমূহ কাজে লাগাতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যি আকৃষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি; কী করতে চাই; সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে আমাদের লক্ষ্য ও ভাবনা কী... তার একটি ভালো গল্প জাতিসংঘে তুলে ধরতে হবে। আমরা বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিতে চাই তাও বিশ্ববাসীকে জানানোর এটাই বড় সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবির্তনের কারণে সাপ্লাই চেইন বদলে যাচ্ছে। এখন আঞ্চলিক বাণিজ্যে ঝুঁকছে অনেক দেশ। এই ট্রেন্ড ধরতে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।  

মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পূর্বশর্ত হলো নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, কর্মস্থলে আচরণ এবং সরকারের সব দপ্তরের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। আফ্রিকার দেশগুলোও এসব পূর্বশর্ত নিশ্চিত করছে। আমাদের শুধু বিনিয়োগ আনার কথা না ভেবে আফ্রিকায় বিনিয়োগ করতে দেশীয় ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।

মেরিটাইম বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউল ইসলাম মুন্না বলেন, আমাদের সুনীল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তেল, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এছাড়া, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আমরা বন্দর, সড়ক ও বড় বড় সেতু তৈরি করেছি। অর্থনীতিতে এসবের গুরুত্ব এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ধারণাগুলো বিশ্বে তুলে ধরতে হবে। 

তিনি বলেন, আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলনে সরকারকেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

লায়ন ডা. মাজহারুল ইসলাম বলেন, কৃষিতে আমাদের অনেক পণ্য রয়েছে। এখানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সুবিধা নিতে বিদেশিরা এমনকি প্রবাসীরা বিনিয়োগ করতে পারেন।    

বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি, বর্তমানে প্রবাসী ব্যবসায়ী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা খান বলেন, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির বার্তা দিতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নগরে নগরে পরিচ্ছন্নতা পরিবেশের নিশ্চয়তা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের সুবিধাও চান বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, অতীতে আমাদের একটি ভুল (রং রুটে) ব্র্যান্ডিং হয়েছে। তা হলো বাংলাদেশ সস্তা শ্রমের দেশ। কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের দেশের ছেলেরা যে সারা বিশ্বে নানা ক্ষেত্রে প্রতিবার স্বাক্ষর রাখছেন; তা কিন্তু ব্র্যান্ডিং করা হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন এদেশে সব ধরনের নিরাপত্তা পায় তা নিশ্চিত করাটা জরুরি।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বিশ্বে এই বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে, আমাদের এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিকব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই; যেখানে সব নাগরিক ও বিদেশিরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবেন।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, রেমিট্যান্স প্রেরণে প্রবাসীরা আগের তুলনায় স্মার্ট হয়েছেন। তাদের রোজগারেও উন্নতি হয়েছে এবং তারা বর্তমানে বেশি অর্থ বৈধ চ্যানেলে দেশে পাঠান। কিন্তু প্রবাসীরা নানা কারণে কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হন। তারা আমাদের দূতাবাসগুলোতে প্রয়োজনে সবসময় সহায়তা পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তারা দেশে ফিরে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গেলেও নানাবিধ সমস্যার মধ্যে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দরকার। তাহলে তারা দেশে ফিরে নিজেরাই আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত