বিদ্যুতের সঙ্গে বন্ধ রোজগারও

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপাকে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা; বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন বন্ধের পাশাপাশি প্রতিদিন দিনে ৫-৬ ঘণ্টা কাজ ভেস্তে যাওয়ায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আজগর আলীর মতো প্রান্তিক কর্মজীবীরা।

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

সকাল ৯টায় যখন দোকানের ঝাঁপ খোলা হয়, তখন কাজের ব্যস্ততায় দিন শুরুর কথা থাকলেও থমকে যেতে হয় বিদ্যুতের অপেক্ষায়। বেলা গড়িয়ে দেড়টা বাজলেও আয় জমা হয় মাত্র ২০ টাকা! নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এমনই চরম বিপাকে পড়েছেন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কাজের সময় যেমন কমছে, তেমনি হু হু করে কমছে দৈনিক আয়। অথচ এই পরিস্থিতিতেও দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল কিংবা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমেনি বিন্দুমাত্র।

পৌর শহরের থানা মোড়সংলগ্ন উপজেলা কেন্দ্রীয় মসজিদ মার্কেটের লন্ড্রি ব্যবসায়ী আজগর আলী জানান তাঁর কঠিন বাস্তবতার কথা। স্ত্রী ও সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তাঁর তিনজনের সংসার। প্রতিটি কাপড় লন্ড্রি করে তাঁর আয় হতো ১০ টাকা। কয়েক মাস আগেও দিনে প্রায় ১০০টি কাপড়ের কাজ করে দিনে প্রায় ১,০০০ টাকা আয় করতেন তিনি; তখন তাঁর মাসিক বিদ্যুৎ বিল আসত ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু বর্তমান লোডশেডিংয়ের প্রভাবে দিনে ৩০ থেকে ৪০টির বেশি কাপড়ের কাজ তিনি করতে পারছেন না। ফলে দৈনিক আয় নেমে এসেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। আয় কমলেও উল্টো বিদ্যুৎ বিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। তার ওপর যোগ হয়েছে ৮৫০ টাকার মাসিক দোকানভাড়া।

আজগর আলী আফসোস করে জানান, এই দোকানের আয়ের ওপরই তাঁর পুরো সংসার নির্ভর করে। দিনে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে গত কয়েকদিনের তুলনায় লোডশেডিং কিছুটা কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গুরুদাসপুরের কেবল লন্ড্রি নয়, বরং সেলুন, ওয়েল্ডিং, মেশিনচালিত বিভিন্ন কারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও একইভাবে ধস নেমেছে। বিদ্যুৎনির্ভর এই ব্যবসাগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকা মানেই কাজ বন্ধ, আর কাজ বন্ধ থাকা মানেই পুরো আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুদাসপুর জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. ওবাইদুল্লাহ আল মাসুম জানান, মূল চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে ঘাটতি মেলাতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়েছিল। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সমস্যাটি আরও প্রকট রূপ নেয়। তবে বর্তমানে তাপমাত্রা কিছুটা কমায় লোডশেডিংয়ের মাত্রাও কমে এসেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে খুব শিগগিরই পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এসব প্রান্তিক মানুষের কাছে বিদ্যুৎ কেবল এক চিলতে আলো নয়, বরং জীবনের রুটি-রুজির প্রধান শক্তি। দিনশেষে আজগর আলীদের সতত ব্যাকুল চোখ আটকে থাকে বিদ্যুতের সুইচের পানে; কারণ সেই একটি সুইচের ওপরই নির্ভরশীল তাঁদের দোকানের মেশিন, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সংসারের বাজার আর পরিবারের অন্নসংস্থান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত