হামের টিকা সংকটের জন্য দায়ী অন্তর্বর্তী সরকার: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিগত সরকারের সময়ে হামের টিকার তীব্র সংকট এবং তার প্রভাবে টিকাদান ব্যাহত হওয়ার পেছনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ভুলগুলো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংস্থার বরাতে উঠে এসেছে।

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের বারবার দেওয়া সতর্কতা ও চিঠিপত্র সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হামের টিকার সুপ্রতিষ্ঠিত সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। 'মুক্ত দরপত্র' চালুর এই ভুল নীতি এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে দেশে তৈরি হয় টিকার তীব্র সংকট, যার সরাসরি বলি হতে হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ শিশুকে। বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকদের এই সিদ্ধান্তহীনতা ও দায়িত্বহীনতার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হলো প্রাণ দিয়ে।

সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৯ মাসের শাসননামায় স্বাস্থ্য খাতের কার্যকারিতা ও পরিচালনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উত্থাপন করেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা।

তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক লিখিত প্রশ্নে অভিযোগ জানান যে, উক্ত সরকারের মেয়াদে স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসাসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সঠিক সময়ে হামের টিকা সংগ্রহ না করার ফলে তীব্র টিকার অভাব দেখা দেয় এবং এর সরাসরি পরিণতিতে দেশের অনেক শিশু অকালে মৃত্যুবরণ করেছে। অথচ ওই সময়ে ২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থ-বছরের জন্য বাজেট থেকে যে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তার সিংহভাগই ব্যয় করে ফেলা হয়েছে। উক্ত অর্থ কোন কোন খাতে কীভাবে খরচ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট জবাব দাবি করেন সরকারদলীয় এই সাংসদ।

বিগত দুই অর্থ-বছরে স্বাস্থ্য খাতের বিপুল বাজেট বরাদ্দের খতিয়ান

সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সরকারের পক্ষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিগত দুটি অর্থ-বছরের মোট বাজেট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ২০২৪-২০২৫ অর্থ-বছরে মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখা। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৫-২০২৬ অর্থ-বছরে এই বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে মোট ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এই বিপুল অঙ্কের টাকা মূলত পরিচালন খাত এবং উন্নয়ন খাত এই দুটি প্রধান বিভাগে ভাগ করে ব্যয় করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের সার্বিক বিবরণ

মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যয়ের বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান, পরিচালন বা রাজস্ব খাতের আওতায় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতালের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা নিয়মিত প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আগত রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনামূল্যে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ, হাসপাতালসমূহের অবকাঠামো ও ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রশাসনিক খরচ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন খাতের অধীনে সারা দেশে নতুন হাসপাতাল ভবন ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণসহ নানাবিধ অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সংগ্রহ অব্যাহত রাখা হয়েছিল। এছাড়াও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের বিভিন্ন মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ এবং স্বাস্থ্য খাতের জনবলকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় এই অর্থ ব্যয় করা হয়।

ভুল নীতি ও দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তনে আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা

তিনি জানান, বিগত সরকারের সময়ে হামের টিকার তীব্র সংকট এবং তার প্রভাবে টিকাদান ব্যাহত হওয়ার পেছনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ভুলগুলো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংস্থার বরাতে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন বা গ্যাভির সহায়তায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সরাসরি সংগ্রহ করে আসছিল। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘদিনের এই সুপ্রতিষ্ঠিত ও সফল পদ্ধতি হঠাৎ পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিকা কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তৎকালীন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে জানান, জরুরি জীবনরক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে সাধারণ মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি একদমই উপযুক্ত নয় এবং এর ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। এই বিষয়ে সতর্ক করে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৫ থেকে ৬টি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয় এবং প্রায় ১০টি জরুরি বৈঠকে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা হলেও তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অন্যান্য অগ্রাধিকারের কারণে বিপর্যয়

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালু করার পরপরই অর্থ ছাড় ও ফাইল অনুমোদন সংক্রান্ত নথিপত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক গুদামে টিকার পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত সম্মতি ও তহবিল ছাড় না হওয়ায় টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে মারাত্মক বিলম্ব ঘটে। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ৬ মাস ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ ও সার্বিক পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মতো নিত্যদিনের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার দিকে নীতিনির্ধারকদের পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ক্যাম্পেইন বাতিল ও দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব

মন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার কারণে দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিপূরক হাম-রুবেলা বা এমআর বিশেষ ক্যাম্পেইন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে দেশজুড়ে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। সঠিক সময়ে টিকার যোগান না থাকায় এবং বিশেষ ক্যাম্পেইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে বাংলাদেশের সাধারণ শিশু ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব অতি দ্রুত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত