সংকটে দেশি মাছ, হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

পাবনার নদী-নালা, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি (চীন দুয়ারি) ও বাদাই জালের অবাধ ব্যবহারে সংকটে পড়েছে দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য। মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানেও থামছে না এই ধ্বংসাত্মক জালের ব্যবহার।

ক্ষুদ্র ফাঁসের এই চায়না দুয়ারি জালে রুই, কাতলা, মৃগেলের মতো বড় মাছের পোনা থেকে শুরু করে ট্যাংরা, পুঁটি, বেলে, শিং, মাগুরসহ সব ধরনের ছোট মাছ অনায়াসে ধরা পড়ছে। রেহাই পাচ্ছে না জলজ কীটপতঙ্গ ও। এ জাল জলাশয়ের তলদেশে এমনভাবে পাতা হয় যে, এতে একবার মাছ ঢুকলে আর বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে নদীর প্রজননক্ষম মা মাছ ও রেণু পোনা নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

অসাধু মৎস্যজীবীদের লোভ ও অসচেতনতার কারণে এই জালের বিস্তার ক্রমশ বাড়ছে। হাট-বাজার ও গোপনে অনলাইনে কম দামে পাওয়ায় তারা এটা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। পাবনার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার মিটার চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও এর উৎপাদন ও অবৈধ আমদানি বন্ধ হচ্ছে না।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জাল ও বাদাই জালের ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে নদী, বিল ও জলাশয়ের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান চরমভাবে ব্যাহত হবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশীয় অনেক মাছের অস্তিত্ব কেবল জাদুঘরে টিকে থাকবে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পরিবেশবাদীরা জানান, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে ক্ষান্ত না হয়ে, চায়না দুয়ারি জালের কারখানা ও উৎসস্থলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো এই জাল এখন প্রকাশ্যে ও গোপনে উৎপাদন এবং বাজারজাত করা হচ্ছে। তারা জানান, মৎস্য অধিদপ্তর বলছে নির্ধারিত আকারের চেয়ে ছোট ফাঁসের জাল আইনত নিষিদ্ধ। এবং বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও ধ্বংস করছেন তারা। কিন্তু পাবনার ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ উৎপাদন কারখানা থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতএব শুধু জেলেদের ধরে জাল পুড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদক, মজুদদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাÑ সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।

সরেজমিনে পাবনার চলনবিল, ডিকশির বিল, খলিশাগাড়ি বিল, রহুল বিল, কাজলকুড়া বিল, গাজনার বিলসহ বিভিন্ন বিল ও নদী ঘুরে দেখা গেছে, ৫০ থেকে ১০০ ফুটের অসংখ্য জাল পানির নিচে সোজা করে পেতে রাখা হয়েছে। জালের রিং বা খোপগুলো ঠিকঠাক রাখতে বাঁশ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। জালের এক পাশের মুখ বা দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করছে মাছ। প্রবেশ করার পরপরই আটকে যাচ্ছে জালে। শুধু মাছ নয় সাপ, ব্যাঙ, কুচিয়া, কাকড়া, কচ্ছপ, শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীগুলোও আটকে যাচ্ছে এই জালে।

মৎস্য শিকারি মিলন জানান, সকাল থেকে বেড়ার কাজলকুড়া বিলে খড়া পেতে বসে আছেন তিনি। কিছু পুঁটি ছাড়া কোনো মাছের দেখা পাননি। তিনি জানান, আগে খরায় রুই, কাতল, বোয়াল, চিতলসহ বড় বড় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে চায়না দুয়ারি, বাদাই, কারেন্ট জাল পেতে পোনা মাছ নিধন করায় বিলে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।

গাজনার বিলে চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরছেন, আয়নাল, রুবেল, সাদ্দাম নামের কয়েকজন জেলে। তবে এই জাল দিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না তারা। তারা জানান, এই জাল দিয়ে মাছ ধরলে মাছগুলো মরে না। এবং ছোট বড় সব ধরনের মাছ জালে ধরা পড়ে। বিলে মাছ কমে যাওয়ায় এভাবেই সহজ পদ্ধতিতে মাছ ধরছেন তারা।

চাটমোহর উপজেলার ফৈলজানা ইউনিয়নের বাসিন্দা জয়নাল, নৌকার মাঝি শাহাদৎ ও রহিম জানান, আগে ডিকশি ও গজারিয়া বিলে প্রচুর রুই, কাতল, মৃগেল, শৈল, টাকি, গজার, পাবদা, ট্যাংরা, বাইমসহ মলা ঢেলা মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে বিলে পানি এলেও আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। দুই একটা বড় মাছ পাওয়া গেলেও দাম হাতের নাগালের বাইরে। তারা জানান, বিলে বর্ষার পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু অসাধু জেলেদের তৎপরতা বেড়ে যায়। আগে কারেন্ট ও বাদাই জাল দিয়ে মাছ ধরলেও বর্তমান আরও ভয়ংকর জাল দিয়ে মাছ ধরছে তারা। তারা জানান, ক্ষতিকর এই জাল দিয়ে মাছ ধরার ফলে পোনা মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে বিলে আর আগের মতো মাছ থাকে না।

চাটমোহরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, জলাভূমি ভরাট ও প্রজনন মৌসুমে চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল ব্যবহারের ফলে চলনবিল থেকে চিতল, ষোল, গজার, ফোলি, বেলে, চিংড়ি, বাঁশপাতা, পাবদা, চাঁদা, গুড়পুই, বাছাসহ বিভিন্ন মাছ দেখা যায় না। কিছু অসাধু মাছ ব্যবসায়ী ও জেলে বেশি লাভের আশায় নির্বিচারে মা ও পোনা মাছ বিল থেকে ছেঁকে তুলছে। যার কারণে দিন দিন বিল থেকে দেশীয় মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, জীবিকার তাগিদে কিছু জেলে সহজ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। তাদের জন্য বিকল্প জীবিকা, প্রশিক্ষণ ও বৈধ মাছ ধরার উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে জীবিকার সংকট বলে অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ব্যবহারের বৈধতা দেওয়া যাবে না।

নামপ্রকাশ না করার শর্তে ফরিদপুরের কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উপজেলার ডেমরা, রতনপুর, আগপুঙ্গলী, গোপালনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়িতে তৈরি হচ্ছে এসব অবৈধ জাল। আয়তন ভেদে এগুলো জেলেদের কাছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তারা এসব জালের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ, হাটবাজারে নজরদারি এবং ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করার দাবি জানান।

ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে ইমামা বানিন জানান, কারখানায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জাল ও জাল তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে তা ধ্বংস করা হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, অবৈধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিল ও কারখানায় সরাসরি অভিযান চালানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত