তিস্তার ভাঙনে নির্ঘুম রাত, বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে কয়েক শত একর ফসলি জমিসহ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ও বন্যায় সব হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিপাড়া, ডাক্তারপাড়া, দালালপাড়া ও ভারতপাড়ার প্রায় দুই শতাধিক পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

থেতরাই ইউনিয়নের হোকডাঙ্গা মাঝিপাড়া এলাকার বিধবা জসদা রাণী (৭০) জানান, তিস্তার ভাঙনে তাঁর বসতভিটার অর্ধেক নদীগর্ভে চলে গেছে। বাকি অর্ধেক জায়গায় পরিবার নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত কাটাচ্ছেন তিনি। তাঁর পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম সন্তান সুশান্ত চন্দ্র দাস (৪৫)। মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করাই তাঁর পেশা।

সুশান্ত চন্দ্র দাস বলেন, মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। বসতভিটার বাকি অংশটুকুও নদীতে চলে গেলে নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকায় আরও ১০ থেকে ১৫টি বাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীতীরের বাসিন্দা মনোরঞ্জন, গোপাল ও দুলাল চন্দ্রের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। এরই মধ্যে ডাক্তারপাড়ার প্রায় ৮ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড নামমাত্র কাজ করেছে। জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।

স্থানীয় ফুলবাবু ও বেলাল হোসেন জানান, তিস্তার বাম তীরে ভাঙন রোধে উপজেলার দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা ইউনিয়নে তীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে হোকডাঙ্গা এলাকায় মাত্র এক কিলোমিটার তীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় সেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাঁরা ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।

থেতরাই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনিছুর রহমান জানান, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৬ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দিয়েছে।

ভাঙনের হুমকিতে থাকা হোকডাঙ্গা গ্রামের বাবলু চন্দ্র দাস, পঁচা চন্দ্র দাস, গোপাল চন্দ্র দাস, মমিনুল ইসলাম ও বেলাল মিয়াসহ স্থানীয়রা বলেন, গত কয়েক দিনের তিস্তার ভাঙনে নদীতীরের মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। তাঁদের এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে অল্প কিছু জিও ব্যাগ অপরিকল্পিতভাবে নদীতে ফেলা হয়েছে। পাইলিং না করে পাড় থেকে নিচে জিও ব্যাগ ফেলায় তিস্তার তীব্র স্রোতে সেগুলো সরে গিয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তাঁরা বলেন, নামমাত্র ভাঙন রোধের কাজ করে যদি বাড়িভিটা নদীতে চলে যায়, তাহলে তাঁরা কোথায় যাবেন। দ্রুত জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে ভাঙন ঠেকানোর জোর দাবি জানান তাঁরা।

স্থানীয়রা আরও জানান, গত বছর ওই এলাকায় তিস্তার ভাঙনে বাড়িভিটা হারিয়ে ১৫ থেকে ২০টি পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। বর্তমানে তারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়ন তিস্তা নদীবেষ্টিত। এসব ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামার হাট, সাতালস্কর, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক, টিটমা, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোরপুর, বামনপাড়া, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, ঠুটাপাইকার, কর্পুরা, লাল মসজিদ, অর্জুন ও রতিদেবসহ অন্যান্য এলাকা ভাঙনপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এসব এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ করা হলেও অনেক এলাকায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে থেতরাই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিপাড়া অন্যতম।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, হোকডাঙ্গা মাঝিপাড়া এলাকায় তিস্তার ভাঙনের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। ওই এলাকায় নদীভাঙন রোধে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম আরিফ হোসেন জানান, ভাঙন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০০টি জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত