সার সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনা

  • পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষক কেন সার পাচ্ছেন না, প্রশ্ন বিরোধী দলের
  • নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী
  • ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে’
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

চলমান সার সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। বুধবার রাতে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।

আলোচনা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

আলোচনা উত্থাপনের কারণ হিসেবে বলা হয়, বর্তমানে সারা দেশে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপিসহ প্রয়োজনীয় সারের সংকট দেখা দিয়েছে। সঠিক সময়ে সার না পাওয়া এবং বাজারে সারের সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে সারা দেশের কৃষিকাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সারের অপ্রতুলতায় কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন না হওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় সময়মতো সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে মারাত্মক খাদ্যঘাটতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা, সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিষয়টির ওপর সংসদে অবিলম্বে আলোচনা হওয়া জরুরি বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষক সার পাচ্ছেন না—এমন পরিস্থিতি সরকারের সার ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা। সার সংকট আগামী রবি ও বোরো মৌসুম পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।

সার সংকটের অতীত ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য হলো, বাংলাদেশের সার সংকট এবারই প্রথম নয়। ২০০৮ সালে একবার সার সংকট হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সার সংকট হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তখন সারের এই অধিকারের জন্য আইএমএফ এবং ইউনাইটেড স্টেটসের হিউম্যান রাইটস রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৩ থেকে ১৯ জন কৃষককে পুলিশের গুলিতে জীবন দিতে হয়েছে।’

বর্তমান সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের বর্তমান এই সংকটে সরকারের তথ্যপত্রে সার অতিরিক্ত মজুত আছে। একটা বড় প্রশ্ন হলো—সার যদি অতিরিক্ত মজুত থাকে, তাহলে গতকাল আমি আমার নির্বাচনী আসন উলিপুরে গিয়েছিলাম। কৃষকরা আমাকে এসে বলছে যে সার পাচ্ছে না। সার পেতে হলে কালোবাজারে যেতে হচ্ছে।’

কৃষিমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক সার ডিলার এখনো বহাল থাকলেও অনেকে পলাতক রয়েছেন। ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য পদে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন করে প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এর আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামীকাল। নতুন ডিলারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন হতে পারে। তারা নিজে একজন এবং অতিরিক্ত আরও দুজন খুচরা ডিলার নিয়োগ করতে পারবেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সরকারের কাছে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহনাধীন সারও রয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিসিআইসি ও বিএডিসির গুদামগুলোতে প্রয়োজনীয় সার বিতরণ ও মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, ২৯ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিচ্ছিন্ন ২২টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও ম্যাজিস্ট্রেটরা ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।

সারের দামের পার্থক্যের কারণে ভারত ও মিয়ানমারে সার পাচারের প্রবণতার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে সার জব্দ করা হয়েছে।

কৃষক কার্ডের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির অংশ। কৃষক কার্ডের জরিপ চলছে এবং আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে দেশের প্রায় দুই কোটি কৃষককে এর আওতায় আনার কাজ চলছে।

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কাগজে-কলমে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলা হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে মাঠপর্যায়ে তীব্র সার সংকটে কৃষকেরা হাহাকার করছেন। সারের কৃত্রিম সংকট, অনিয়ম ও ডিলার নিয়োগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বোরো মৌসুমের আগেই ডিলার পর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কথা উঠেছে, সারে নাকি আমাদের পুরো দেশ ভাসছে। ওকে, ভাসছে মেনে নিলাম। কিন্তু প্রথম আলোর রিপোর্ট বলছে, ন্যায্যমূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সার পাচ্ছে না কৃষক। এটা জামায়াত বা বিরোধী দলের বট বাহিনীর কোনো রিপোর্ট না।’

সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রামে রাতভর অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা ২ হাজার ১৫০ কেজি সার জব্দ হয়েছে। গোডাউন ভেঙে ১০ হাজার কেজি সার নিয়ে গেছে কৃষকেরা। কেন গোডাউন ভাঙতে হলো? তার মানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে ভর্তুকির সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে। কিছুদিন আগে উখিয়া ও টেকনাফে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, প্রভাবশালী চক্র সার পাচার করে ওখান থেকে ইয়াবা ও আইসের মতো মারাত্মক মাদক আমাদের দেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ভর্তুকির বদলে দেশে ফেরত আসছে বিষ।’

শফিকুল ইসলাম বলেন, সার নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও গুজবের কারণে কৃষক আজ আস্থার সংকটে ভুগছেন এবং অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। এই অস্থিরতা থেকে বাঁচতে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমদানির ওপর নির্ভর না করে বোরো মৌসুমের আগেই ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপির ডিলার পর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। সুষ্ঠু বিতরণ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা গেলে তবেই কৃষক রেহাই পাবেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, ‘প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদকে। আজকে স্বীকার করছেন যে বট বাহিনী এবং জামাত অপপ্রচার করে না। ধন্যবাদ জানাই, আপনারা করতেছেন। আর আমরা আপনাদের গৃহপালিত বলতে চাই না। আমরা এই সংসদ গৃহে আপনাদের রাখতে চাই। আপনারা দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে কথা বলুন। ষড়যন্ত্র কইরেন না।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার বিরোধী দলের বক্তব্য শুনতে এবং পরামর্শ নিতে চায়। সার সংকটসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য উঠে চলে গেছেন। উনি থাকলে আমি বলতাম। উনি যখন বক্তৃতা দেন, তখন উকিল আব্দুল সাত্তারের কথা মনে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উনি ছয়বারের এমপি ছিলেন। বেইমানির কারণে জানাজায় ছয়জন মানুষ কপালে জোটেনি। ওনার বেলায় কী হবে, আমি বলতে পারছি না। আল্লাহই বাকি জানেন।’

সার সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।’ কোথাও সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিমকে জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, বর্তমানে আমন ধানের মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ সময়ে সারের চাহিদা তুলনামূলক কম। সামনে রবি মৌসুমের জন্য অনেক কৃষক আগাম সার কিনে রাখছেন। এ কারণে কিছু এলাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে।

তিনি জানান, দেশের ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দুইজন যুগ্ম সচিব ও দুইজন উপসচিবের তত্ত্বাবধানে এসব সেল কাজ করছে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনিয়মের ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।

সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারের চাহিদা ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। বিপরীতে সরবরাহ থাকবে ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। ফলে ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন সার উদ্বৃত্ত থাকবে।

কৃষক কার্ডের কার্যক্রম তুলে ধরে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের জমির পরিমাণ অনুযায়ী কতটুকু সার প্রয়োজন, সে তথ্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে সারের অপচয় কমবে এবং কৃষকের সার ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত