চার মাস পর ফের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেল চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো)। গত সোমবার থেকে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কারখানাটিতে কমিয়ে দেওয়া হয় গ্যাস সরবরাহ। গত মঙ্গলবার বিষয়টি জানাজানি হয়।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, কাফকোতে এতদিন দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সোমবার থেকে তা কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ দেওয়া হবে।
তবে কাফকো কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াই উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ নয়। নিয়ম অনুযায়ী, তিন বছর পরপর কারখানায় বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং করা হয়। এবারও সেই নির্ধারিত কাজের অংশ হিসেবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। কাফকোর চিফ অব পার্সোনেল ফারুখ আহমেদ বলেন, প্ল্যান্টের সচলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন বছর পরপর এক থেকে দেড় মাসের জন্য ওভারহোলিং করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় টিউনিং শেষ হলে কারখানা আবার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরবে। এর আগে, দীর্ঘ প্রায় দুই মাস গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পর গত ১ মে কাফকো-তে ফের গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রস্তুতি শেষে ২ মে বিকেল থেকে উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। তখন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছিল।
বর্তমানে কাফকোর দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টন ইউরিয়া এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক ৩২ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়।
কাফকোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ওপরও। কারণ, এই কারখানার উৎপাদনের জন্য কাফকো থেকে পাওয়া অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।
সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ সিইউএফএল : কাফকোর পাশেই রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে (সিইউএফএল) দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ। গ্যাস সংকটের কারণে চলতি বছরের ৪ মার্চ কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়। আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত কারখানাটি টানা সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ ছিল।
সিইউএফএল সূত্র জানায়, গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিভিন্ন সময়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। এক সময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে কার্যকর সক্ষমতা কমেছে। কারখানাটির উৎপাদন বন্ধের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত কারখানাটি কয়েক দফায় অনেক দিন বন্ধ ছিল। সর্বশেষ গত ৪ মার্চ গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়। এরপর গত ২৫ আগস্ট সকালে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এতে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা কারখানাটিতে শিগগিরই ইউরিয়া উৎপাদন শুরুর আশা ছিল কর্তৃপক্ষের। প্রায় ১৪ দিন পেরিয়ে গেলেও কারখানাটি গ্যাস সরবরাহ পেয়েও এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এ বিষয়ে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহসহ সবকিছু ঠিক থাকলে আশা করছি বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে ডিএপি : সিইউএফএলের পাশে অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানাটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। গত ১৮ এপ্রিল রাতে কারখানায় মজুদ থাকা অ্যামোনিয়া শেষ হয়ে গেলে প্রথম দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়। কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেখান থেকে অ্যামোনিয়া পেয়ে ৮ মে কারখানাটি আবার উৎপাদনে যায়। কিন্তু জর্ডান থেকে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় ২৮ জুন সকাল থেকে কারখানাটির উৎপাদন ফের পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ৬০০ টন ফসফরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয় এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার টন মজুদ রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন চালুর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ডিএপিএফসিএলের দুটি ইউনিটে দৈনিক ৮০০ টন করে মোট ১ হাজার ৬০০ টন ডিএপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
দেশীয় উৎপাদনে চাপ, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা : কাফকো, সিইউএফএল ও ডিএপিএফসিএল চট্টগ্রামের তিন গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানার উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়ায় দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। গ্যাস, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের সংকটের কারণে কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার টন। সংসদে কৃষিমন্ত্রীও এই চাহিদার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাগুলো থেকে প্রায় ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের বিপরীতে বাকি প্রায় ১৬ লাখ টন আমদানির প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন বারবার ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। কাফকোর নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত শেষ করে উৎপাদনে ফেরানো এবং সিইউএফএল ও ডিএপিএফসিএলে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন মৌসুমে দেশে সার সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।