রিজিকের দরজা উন্মোচনের উপায়

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

মানুষের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন হলো মহান আল্লাহর দেওয়া প্রশস্ত রিজিক। সম্পদ, পোশাক, পানীয়, খাদ্য, বাসস্থান, সুস্বাস্থ্য এবং আরও অসংখ্য নেয়ামত মহান আল্লাহ অনুগ্রহ ও অনুকম্পা হিসেবে বান্দাদের দান করেছেন। তিনি শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী রিজিকদাতা। তার ওপর কারও কোনো অধিকার নেই, তবে তিনি নিজে যা নিজের ওপর অপরিহার্য করেছেন, তা ব্যতীত। তিনি সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত। সবাই তার মুখাপেক্ষী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সুরা ফাতির ১৫) তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, প্রবল শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা যারিয়াত ৫৮)

বিবেকবানরা উপলব্ধি করেন যে, প্রত্যেক বিষয়ের একটি কারণ রয়েছে এবং প্রত্যেক লক্ষ্য অর্জনের একটি পথ রয়েছে। তাই পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তার প্রজ্ঞার দাবি অনুযায়ী রিজিকের জন্য কিছু উপায় নির্ধারণ করেছেন। এমন কিছু চাবিকাঠি রেখেছেন, যার মাধ্যমে রিজিকের দরজা উন্মুক্ত করা যায়। যে ব্যক্তি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে এবং নিজের প্রয়োজন পূরণ করতে চায়, তার জন্য সেসব উপায় অবলম্বন করা অপরিহার্য।

উপায়গুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে আল্লাহর প্রতি ইমান এবং প্রকৃত তাকওয়া অবলম্বন। মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার নির্দেশ পালন করবে এবং তার নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকবে, তার জন্য তিনি পথ বের করে দেবেন। দুনিয়া ও আখেরাতের সব সংকট থেকে তাকে মুক্তির পথ দেখাবেন। এমন স্থান থেকে তাকে রিজিক দান করবেন, যা তার কল্পনাতেও আসবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক ২-৩)

মহান আল্লাহ আরও জানিয়েছেন, যদি জনপদের মানুষ রাসুলদের নিয়ে আসা সত্যের প্রতি ইমান আনত এবং তাদের রবকে ভয় করত অর্থাৎ আনুগত্যের কাজ করত, হারাম থেকে বিরত থাকত এবং সন্দেহজনক বিষয়গুলো পরিহার করত, তাহলে আল্লাহ তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতেন। এর মাধ্যমে তাদের জীবন হতো সচ্ছল ও সুন্দর। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ ৯৬)

হে আল্লাহর বান্দারা! রিজিক লাভের অন্যতম উপায় হলো মহান আল্লাহর ওপর সত্যিকার তাওয়াক্কুল করা এবং তার আশ্রয় গ্রহণ করা। তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ হলো, যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা, সব বিষয় তার কাছে সোপর্দ করা এবং তার বান্দার জন্য তিনিই যথেষ্ট, এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। এটি আল্লাহর তাওহিদেরই দাবি। কারণ আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই, কোনো রিজিকদাতা নেই, কোনো দানকারী নেই এবং কোনো প্রতিরোধকারীও নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়।

হে আল্লাহর বান্দারা! তাওয়াক্কুলের অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা ও কর্ম ত্যাগ করবে। বরং তাওয়াক্কুলের সঙ্গে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য পৃথিবীতে চেষ্টা ও পরিশ্রম করা অপরিহার্য। এ দুটি বিষয়ে কোনো বিরোধ নেই। কারণ তাওয়াক্কুল হলো অন্তরের ইবাদত আর চেষ্টা ও শ্রম হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ইবাদত। উভয়টিই আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদত।

মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি পৃথিবীকে তাদের জন্য চলাচলের উপযোগী ও সহজ করেছেন। এতে মানুষের জন্য বিভিন্ন উপকার ও সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর পথঘাটকে চলাচলের উপযোগী করেছেন এবং তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচরণ করে জীবিকা ও উপার্জনের সন্ধান করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন। অতএব তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তার রিজিক থেকে আহার করো। আর তার কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা মুলক ১৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াক্কুলের মর্যাদা এবং এর সঙ্গে চেষ্টা ও কর্মের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি)

ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন রিজিকের সন্ধানে চেষ্টা না করে বসে বসে এই কথা না বলে যে, হে আল্লাহ! আমাকে রিজিক দিন। অথচ সে জানে, আকাশ থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য বর্ষিত হয় না।’

রিজিক লাভের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় হলো বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং সব গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে তওবা করা। রিজিক লাভের অন্যতম আরেকটি উপায় হলো দোয়া করা। মহান আল্লাহ তার বান্দাদের দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, যারা দোয়া থেকে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা প্রকৃতপক্ষে তার ইবাদত থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা গাফির ৬০)

দোয়া এমন এক মহান ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের কল্যাণ লাভ করে। ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, দুনিয়ার কল্যাণের মধ্যে রয়েছে মানুষের সব ধরনের কাক্সিক্ষত বিষয়। যেমন সুস্বাস্থ্য, প্রশস্ত বাসস্থান, নেক ও উত্তম স্ত্রী, পর্যাপ্ত রিজিক, উপকারী জ্ঞান, সৎকর্ম, আরামদায়ক বাহন, মানুষের সুন্দর প্রশংসা এবং এ ছাড়া আরও বহু কল্যাণ। আর আখেরাতের কল্যাণের সর্বোচ্চ রূপ হলো জান্নাতে প্রবেশ করা। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মহাভীতির দিন নিরাপত্তা লাভ, হিসাব সহজ হওয়া এবং আখেরাতের অন্যান্য কল্যাণ।

রিজিক লাভ এবং উপার্জনে বরকত অর্জনের আরেকটি উপায় হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহর আনুগত্য এবং তার নির্দেশ পালন। এটি এক ধরনের সদকা। আর সদকা সম্পদকে বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধ করে।

আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক অথবা তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি)

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। শরিয়তসম্মত উপায়ে রিজিক অনুসন্ধান করুন। অবিরাম আশা, অধিক দোয়া এবং সুখে-দুঃখে নিজের আমল সংশোধনের মাধ্যমে রিজিকের বন্ধ দুয়ারগুলো খুলতে চেষ্টা করুন।

রিজিক লাভের অন্যতম উপায় হলো কল্যাণ, সৎকাজ ও মানুষের উপকারের পথে ব্যয় করা। মহান আল্লাহ দানকারীদের জন্য দুনিয়ায় প্রতিদান এবং আখেরাতে সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি সেটার বিনিময় তোমাদের দেবেন। তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সুরা সাবা ৩৯)

রিজিক অর্জনের আরেকটি উপায় হলো জীবিকা অনুসন্ধানে ভোরে ও দিনের শুরুতে কাজ করা। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উম্মতের জন্য দিনের শুরুতে বরকতের দোয়া করেছেন। এ দোয়া জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি জীবনের সব কাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য তাদের দিনের শুরুর সময়ে বরকত দান করুন।’ (তিরমিজি)

হজরত সাখর (রা.) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি দিনের শুরুতেই তার ব্যবসায়িক পণ্য পাঠিয়ে দিতেন। ফলে তিনি ধনী হয়েছিলেন এবং তার সম্পদ এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, কোথায় তা রাখবেন, তা তিনি বুঝতে পারতেন না।

৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত