ভেজাল ও কৃত্রিম সিনথেটিক রঙের ব্যবহার নিয়ে যখন স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখন প্রকৃতির সহজলভ্য উপাদান থেকে রঙ তৈরি করে সম্ভাবনার দ্বার খুলছেন গাজীপুরের দুই নারী উদ্যোক্তা তানিয়া পারভীন ও রাবেয়া খানম। ড্রাগন ফল, গাজরসহ বিভিন্ন ফল, সবজি, অপরাজিতা ফুলসহ বিভিন্ন ফুল ও গাছের পাতা থেকে তৈরি এসব রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে খাবার ও কাপড়ে। নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির এ উদ্যোগ ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
উদ্যোক্তাদের আশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও গবেষণার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে খাবার ও পোশাকশিল্পে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। শুধু খাবারেই নয়, প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে কাপড়ের ক্ষেত্রেও কাজ করছেন এ দুই উদ্যোক্তা। বিভিন্ন ফল, ফুল, গাছের পাতা ও প্রাকৃতিক উপাদান থেকে সংগ্রহ করা নির্যাস দিয়ে কাপড় রঙ করা হচ্ছে। পাশাপাশি করা হচ্ছে ন্যাচারাল ডাইং ও ইকো প্রিন্ট।
রাসায়নিক রঙের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতির উপাদান ব্যবহার করে তৈরি এসব কাপড় যেমন নান্দনিক, ঠিক তেমনি পরিবেশবান্ধব বলেও দাবি উদ্যোক্তাদের। তাদের ভাষ্য, প্রাকৃতিক উপাদান কাজে লাগানোর মাধ্যমে একদিকে পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন উপকরণও নতুন পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। উদ্যোক্তা তানিয়া পারভীন বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস সবজি, ফল, ফুল ও গাছের পাতা থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খাবার ও কাপড়ের রঙ তৈরি করছি। এ বিষয়ে খুলনার বিশুদ্ধ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি থেকে তিন দিন এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক অফিস থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে চুলা, স্টিম মেশিন ও ব্লেন্ডারসহ প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের কাজকে আরও দ্রুত ও সহজ করতে সহযোগিতা করছে।
তানিয়া পারভীন বলেন, চারদিকে যখন ভেজাল ও কৃত্রিম সিনথেটিক রঙের ছড়াছড়ি, তখন বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করি। মানুষের কাছ থেকে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্যসচেতন, তারা প্রাকৃতিক এসব পণ্য খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। বিভিন্ন ক্রেতার কাছে আমরা বিনামূল্যে নমুনা পাঠাচ্ছি এবং তাদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করছি। তারা পণ্য ব্যবহার করে ভালো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় এসব খাবারের রঙের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে সংরক্ষণকাল বা শেলফ লাইফ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। প্রাকৃতিক রঙ তৈরির বড় একটি অংশ আসে সাধারণত ফেলে দেওয়া উপকরণ থেকে। এর মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজের খোসা, বিভিন্ন গাছের পাতা, ডাবের খোসা, হরীতকী, খয়ের ও ডালিমের খোসাসহ নানা প্রাকৃতিক উপাদান। প্রাকৃতিক রঙে তৈরি কাপড়ের জন্য কিছু বিশেষ যতœ প্রয়োজন। সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচর্যা করলে এসব কাপড় বছরের পর বছর ব্যবহার করা সম্ভব। নবজাতক থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের ব্যবহারের উপযোগী কাপড়ে এটি ব্যবহার করা যায়।
আরেক উদ্যোক্তা রাবেয়া খানম বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিপণনের সহায়তায় কিছু দিন আগে আমরা একটা প্রশিক্ষণ নিই, সেখানে আমরা প্রাকৃতিক রঙ তৈরি করা শিখি। বাচ্চারা যেহেতু রঙিন খাবারগুলো বেশি পছন্দ করে, তাই বাচ্চাদের জন্য এই ন্যাচারাল কালারটা একেবারেই সেফ। আমরা বিভিন্ন খাবার যেমন কেক, পুডিং, আইসক্রিম, নাড়–, ডেজার্ট আইটেমসহ যে খাবারগুলোতে কৃত্তিম রঙ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোতে এটা ব্যবহার করছি। এতে কোনো রাসায়নিক ক্ষতিকারক পদার্থ নেই, তাই সবাই নিশ্চিন্তে এটা গ্রহণ করতে পারবে।
গাজীপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. গোলাম মর্তুজা বলেন, তারা যেসব পণ্য তৈরি করেছে তা প্রাকৃতিক রঙ। এটি খুবই সময়োপযোগী এবং এতে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। বরং এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। পরিবেশবান্ধব পণ্য ও খাবার তৈরিতে নারী উদ্যোক্তাদের এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।