নিখোঁজের তিন দিন পর মেঘনায় মিলল বিজিবি সদস্যের মরদেহ

রাকিবের পর আমজাদও ফিরলেন মরদেহ হয়ে। একই ঘটনায় পাঁচ বন্ধুর মধ্যে তিনজন প্রাণে বাঁচলেও রাকিব ও আমজাদের মৃত্যুতে তাদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

মেঘনার তীরে জিওব্যাগ ধসে একসঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন দুই বন্ধু। দুই দিন পর লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে মিলেছিল রাকিব আহমেদের মরদেহ। স্বজনদের অপেক্ষা তখনও শেষ হয়নি—মেঘনার দিকে তাকিয়ে ছিলেন বিজিবি সদস্য মো. আমজাদ হোসেনের পরিবারের সদস্যরা। অবশেষে নিখোঁজের তিন দিন পর শনিবার দৌলতখানের মিজানের চরে ভেসে উঠল আমজাদের মরদেহও।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ৩টার দিকে দৌলতখান উপজেলার মেঘনা নদীর মিজানের চরে ভাসমান অবস্থায় আমজাদ হোসেনের (২৮) মরদেহ দেখতে পান জেলে ও স্থানীয়রা। খবর পেয়ে মির্জাকালু নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি আমজাদের বলে শনাক্ত করেন।

মির্জাকালু নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সনাতন চন্দ্র সরকার বলেন, জেলে ও স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শনাক্ত করেছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নিহত আমজাদ হোসেন ভোলা পৌরসভার ভদ্রপাড়া এলাকার মো. ইব্রাহীমের ছেলে। তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) কর্মরত ছিলেন এবং বান্দরবানের রুমা উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রায় দুই মাস আগে ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁর কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

দুই বছর আগে মোসাম্মৎ মারিয়াকে বিয়ে করেন আমজাদ। তাদের সংসারে নতুন অতিথি আসার অপেক্ষা চলছিল। কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেই মেঘনা কেড়ে নিল স্বামীকে। আমজাদের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মারিয়া বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। ছেলের সন্ধান না পেয়ে মা-বাবাও ভেঙে পড়েছিলেন।

আমজাদের শ্যালক মো. রাজু জানান, ভগ্নিপতি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার বোন মারিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। স্বামীর কী হয়েছে, কোথায় আছেন—এ নিয়ে পরিবারের সবাই দুশ্চিন্তায় ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম।

যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের ‘গরীবের দুবাই’খ্যাত বালুর মাঠ এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে জিওব্যাগের ওপর বসে পাঁচ বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ নদীর তীরের একটি বড় অংশ জিওব্যাগসহ ধসে পড়লে পাঁচজনই খরস্রোতা মেঘনায় পড়ে যান। তিনজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও আমজাদ ও তার খালাতো ভাই রাকিব আহমেদ নিখোঁজ হন।

ঘটনার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে। বৃহস্পতিবার দিনভর মেঘনায় তল্লাশি চালান ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি ও কোস্ট গার্ড সদস্যরা। বরিশাল ও ঝালকাঠি থেকেও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসে অভিযানে যুক্ত হয়। তবে নদীতে তীব্র স্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়ে।

ভোলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার খন্দকার রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, মেঘনায় তীব্র স্রোত থাকায় তীর ধসে পড়া এলাকায় উদ্ধারকারীদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়।

নিখোঁজের দুই দিন পর শুক্রবার সকালে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর একটি চরে রাকিব আহমেদের মরদেহ পাওয়া যায়। স্বজনরা গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করেন। রাকিবের মরদেহ উদ্ধারের পরও আমজাদের সন্ধানে অপেক্ষায় ছিলেন তার স্বজনরা। অবশেষে শনিবার দৌলতখানের মিজানের চরে পাওয়া গেল আমজাদের মরদেহ।

একই ঘটনায় পাঁচ বন্ধুর মধ্যে তিনজন প্রাণে বাঁচলেও রাকিব ও আমজাদের মৃত্যুতে তাদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। আর মেঘনার তীরের ওই দুর্ঘটনা আবারও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত