প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বাতিলের পরই আদানির বিদ্যুৎ বিভ্রাট

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন আগের কাঠামোয় নেই; নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০১ পিএম

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণার পরই বিদ্যুৎ নিয়ে তালবাহনা শুরু করে ভারতের আদানি। একদিনের মধ্যেই আদানি কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে কৌশলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এসব কথা জানিয়েছে।

তিনি জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীর ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত যাচ্ছেন না। ঘোষণার পরদিনই বন্ধ করে দেওয়া হয় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তিনি যাচ্ছেন না। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও বারবার জানিয়েছে বাংলাদেশ।

এর মধ্যেই দেশে নতুন করে তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন নেমে এসেছে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে। একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য এসেছে।

ঘটনাগুলোর সময়ের এই মিলই এখন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—এটি কি নিছক কারিগরি ও জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতা, নাকি ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে?

আগে থেকেই সংকটে ছিল বিদ্যুৎব্যবস্থা

তবে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছিল না। সেপ্টেম্বরের শুরুতে আদানি পাওয়ারও জানায়, ভারতের রেলপথে জট ও কয়লা পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দিনের অফ-পিক সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার চাহিদার সময় সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আদানির কেন্দ্রটি আগের রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিট বন্ধ হয়েছে এবং সেটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

অর্থাৎ আদানির বক্তব্য অনুযায়ী, সংকটের কারণ রাজনৈতিক নয়—প্রথমে কয়লা পরিবহনজনিত সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যাখ্যা কি পুরোপুরি সন্তোষজনক?

২০১৭ সালের চুক্তি, ২৫ বছরের দায়

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থাৎ এটি বর্তমান সরকারের করা চুক্তি নয়। আগের সরকারের সময় করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল রেখেই বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ কিনছে। এখানেই চুক্তিগত দায়ের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কী ধরনের দায় রয়েছে—তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা দেখে মূল্যায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আদানি চুক্তির বিভিন্ন দিক আগেই পর্যালোচনার দাবি তুলেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ ধরনের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে বিরোধ বা চুক্তি লঙ্ঘনের পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকতে পারে—তবে তা চুক্তির ধরন ও শর্তের ওপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ এখন প্রশ্ন শুধু বিদ্যুৎ কেন কমেছে তা নয়; প্রশ্ন হলো—চুক্তিতে এমন পরিস্থিতির জন্য কী সুরক্ষা রাখা হয়েছিল এবং সেই সুরক্ষা এখন কার্যকর হচ্ছে না কেন?

আদানির ব্যাখ্যা কী?

২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার বলেছিল, রেলওয়ে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ এবং কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে গেছে। কোম্পানিটি আরও জানিয়েছিল, তারা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি অবহিত করেছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে কাজ করছে।

কিন্তু এর কয়েক দিন পর যখন উৎপাদন আবার বাড়তে শুরু করল, তখন হঠাৎ একটি ইউনিট বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেল।

পিডিবির একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয় এবং অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে সেটিকে ঠান্ডা হতে হয় এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।

কারিগরি ত্রুটি হওয়া অসম্ভব নয়। বিশ্বের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎচুক্তির ক্ষেত্রে সমস্যাটি কত দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব কমাতে সরবরাহকারী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—সেটিই বড় প্রশ্ন।

রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটের মিল

এখানেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। আগস্টে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে প্রকাশ্য বক্তব্যে সফর-প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।

এরপরও সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই এবং সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে দেয়—তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। কারণ, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং ঢাকার অবস্থান ছিল, তার প্রথম ভারত সফরকে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই হওয়া উচিত।

আর ঠিক পরদিনই সামনে আসে আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর। ঘটনার এই সময়গত নৈকট্যই সন্দেহ তৈরি করছে। তবে সন্দেহ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়।

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে ঢাকা-দিল্লির নতুন বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরলভাবে ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে; তবে ঢাকা এখন নিজের সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোউইচের মতে, অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব স্বার্থ ও আলোচনার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।

এই দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের একটি জায়গায় মিল আছে—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন আগের কাঠামোয় নেই; নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ কি কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে?

এই প্রশ্নটি এখন আর একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে অনেকটা আমদানিনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি এবং ব্যাপক লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে। এ অবস্থায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের একটি আন্তঃদেশীয় কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই একটি কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। আর এ কারণেই আদানি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এর আগে বলেছেন, আদানি চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য থাকলে সেটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আর ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম চুক্তিটিকে একতরফা হিসেবে সমালোচনা করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

অর্থাৎ বর্তমান সংকট নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কি এমন কোনো চুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে?

আরও বড় প্রশ্ন—কেন বিকল্প ব্যবস্থা নেই?

একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া একটি কারিগরি ঘটনা হতে পারে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে যদি তার প্রভাব হাজার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—বাংলাদেশের নিজস্ব বিকল্প উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ‘বাফার’ কোথায়?

কারণ বর্তমান সংকট শুধু আদানির কারণে তৈরি হয়নি। আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল। ১১ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, যেখানে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।  অর্থাৎ আদানি একটি বড় সংকটকে আরও বড় করেছে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাওয়া জরুরি—

১. গোড্ডা কেন্দ্রের বয়লার বা ফিড ইউনিটে ঠিক কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে?

২. ত্রুটিটি শনাক্ত হওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে?

৩. একটি ইউনিট বন্ধ থাকলেও অন্য ইউনিটের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে কি না?

৪. আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি কেন এত দীর্ঘস্থায়ী হলো?

৫. বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানি পাওয়ারের নির্দিষ্ট দায় কী?

৬. সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পেতে পারে?

৭. আদানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প বা সহযোগিতামূলক কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না?

৮. ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কি এই সরবরাহ সংকট সম্পর্কে অবহিত এবং তারা কোনো সমাধানে যুক্ত হয়েছে কি না?

৯. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এই বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না?

শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এবং সবচেয়ে কঠিন।

দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে

বিদ্যুৎ সংকট কখনো শুধু বিদ্যুৎ সংকট থাকে না। লোডশেডিং বাড়লে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ে এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়।

তাই এই সংকটকে বাংলাদেশের ভেতরেও কেউ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কি না, আদানি ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো পক্ষ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী বা ভারতবিরোধী জনমত তৈরির চেষ্টা করছে কি না—এসবও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ বিদেশি চাপ থাকলেও সেটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।

বিদ্যুৎ কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। একইভাবে ভারত বা ভারতের কোনো কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চুক্তিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নয়—চুক্তির শর্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতি এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ আদানির বিদ্যুৎ বিনামূল্যে নেয় না। এই বিদ্যুতের জন্য অর্থ পরিশোধ করে বাংলাদেশ। ফলে এটি কোনো অনুদান নয়; এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। সুতরাং সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—চুক্তি অনুযায়ী তাদের অধিকার কোথায়?

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল

  • শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
  • বাংলাদেশ ‘অনুকূল পরিবেশ’ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে ভারত না পাঠানোর অবস্থান জানিয়েছে।
  • ১০ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সফর থেকে তারেক রহমানের সরে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
  • এবং তার পরদিনই আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও বেড়েছে।

এই ঘটনাগুলো পরপর ঘটেছে—এটি তথ্য। কিন্তু এগুলো পরস্পরের কারণে ঘটেছে—এটি এখনো প্রমাণিত নয়। সুতরাং তদন্তের জায়গাটি এখানেই।

যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে আদানি পাওয়ারকে দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন।

ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক প্রতিহিংসার নয়, পারস্পরিক স্বার্থের হওয়া উচিত। আর বিদ্যুৎ—কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।

আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই—

তারেক রহমান দিল্লি গেলেন না, আর ঠিক তখনই কেন আদানির বিদ্যুৎ কমল—এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে আরও কোনো হিসাব আছে? উত্তরটি রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, চুক্তি, নথি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ডেটা এবং আদানি ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের জবাবেই খুঁজতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত