কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান
পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল
ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। নব্বই মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই, গতি, আবেগ ও কৌশলের সমন্বয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ^কাপে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠেছিল নতুন বিষয়, ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। ম্যাচের মাঝপথে তিন মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রেখে খেলোয়াড়দের পানি পান ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যুগোপযোগী পদক্ষেপ বলছেন, কেউ একে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্প্রচার-সুবিধার কৌশল নামেও অভিহিত করছেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তবতায় হাইড্রেশন ব্রেক বিশ্ব ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
ফুটবলে হাইড্রেশন ব্রেক
ফুটবলে হাইড্রেশন ব্রেকের ধারণা নতুন নয়। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফিফা অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ম্যাচ চলাকালে খেলোয়াড়দের পানি পানের জন্য আনুষ্ঠানিক বিরতি দেয়। এরপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও ছিল। ২০২৬ বিশ^কাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে। এর মধ্যে অনেক ভেন্যুতে দিনের বেলায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ফিফা বাধ্যতামূলকভাবে হাইড্রেশন ব্রেক চালু করেছিল। প্রতি অর্ধে ৩০ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে তিন মিনিটের এই বিরতি দেওয়া হয়।
ফুটবলে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
একজন ফুটবলার ম্যাচ চলাকালে গড়ে ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ান। তীব্র গরমে এই শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর থেকে ২-৩ লিটার পরিমাণ ঘাম বের হয়। ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যায় পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট। দেহের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। শরীরের ওজনের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং শারীরিক দক্ষতা কমে যেতে পারে। ৩ থেকে ৪ শতাংশ পানি হারালে দেখা দিতে পারে মাথা ঘোরা, পেশিতে খিঁচুনি এবং হিট এক্সহসশন। ৫ শতাংশের বেশি পানি হারালে হিট স্ট্রোকের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। হাইড্রেশন ব্রেকের সময় খেলোয়াড়রা শুধু পানি পান করেন না; অনেকেই ইলেক্ট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করেন, যা শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাইড্রেশন ব্রেক
হাইড্রেশন ব্রেকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো খেলোয়াড়দের তাপজনিত অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে। এতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে, পেশির খিঁচুনি ও ক্লান্তি হ্রাস পায়, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় থাকে এবং চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরা খেলোয়াড়দের দ্রুত স্বাস্থ্য মূল্যায়নের সুযোগ পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে হাইড্রেশন ব্রেক শুধু সুবিধা নয়, বরং ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা।
হাইড্রেশন ব্রেকের বাস্তবতা
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ক্রীড়াজগতেও বড় প্রভাব ফেলবে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। ফলে ফুটবল, ক্রিকেট, ফুটবলের ঐতিহ্য ও আধুনিক ক্রীড়া চিকিৎসার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়ার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের খেলাধুলার নতুন দিকনির্দেশনা।