একসময় তারা ছুটত, উড়ত, গাছে চড়ত, শিকার করত কিংবা ঘুরে বেড়াত। কারও শরীর ছিল কয়েকশ কেজি ওজনের, কারও শরীর ছিল হাতের মুঠোয় ধরার মতো ছোট। কেউ ছিল বনের রাজা, কেউ মানুষের ঘরের সঙ্গী। আজ তারা নেই। কিন্তু আছে তাদের হাড়, অস্থি আর শরীরের নানা অংশ। সেই নিঃশব্দ শরীরগুলো এখন বলে জীবনের গল্প। শেখায় কীভাবে একটি প্রাণীর শরীর তৈরি হয়, কীভাবে তার অঙ্গগুলো কাজ করে, আর কীভাবে সেই জ্ঞান একদিন বাঁচাতে পারে আরেকটি প্রাণ।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) অ্যানাটমি মিউজিয়ামে ঢুকলেই এমন এক ভিন্ন জগৎ চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালদেহী জিরাফের কঙ্কাল যেন প্রথমেই থামিয়ে দেয় দর্শনার্থীদের। অ্যানাটমি মিউজিয়ামে ঢুকলে দেখা যায় হাতি, ঘোড়া, বাঘ, কুমির, বানর, কুকুর, বিড়ালসহ নানা প্রাণীর কঙ্কাল ও অস্থি। একটু দূরে কাঁচ ঘেরা বাক্সে সাপের দীর্ঘ কঙ্কাল, টিকটিকি ও অন্য সরীসৃপের নমুনা। কোথাও পাখির স্ট্যাফ করা অবয়ব, কোথাও ফরমালিনে সংরক্ষিত প্রাণীর ভ্রুণ। আবার অন্যদিকে রাখা কাচের পাত্রে দেখা যায় হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই জাদুঘরটির যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চশিক্ষা ও মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর এখন শুধু দর্শনার্থীদের কৌতূহল মেটানোর জায়গা নয়, সিভাসুর অ্যানাটমি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও। এখানে রাখা প্রতিটি কঙ্কাল একজন শিক্ষার্থীর কাছে নিছক হাড় নয়। বইয়ের পাতায় যে কঙ্কাল এতদিন ছবি হয়ে ছিল, সেটিই এখানে বাস্তব।
অ্যানাটমির শিক্ষার্থীরা এখানে শুধু দেখে নয়, হাতে-কলমে শিখছে। কোন হাড় কোথায় থাকে, কোন অঙ্গের অবস্থান কোথায়, একটি প্রাণীর শরীরের সঙ্গে অন্য প্রাণীর গঠনের পার্থক্য কোথায়, এসব বাস্তব নমুনার মাধ্যমে শেখার সুযোগ তাদের। আজ শ্রেণিকক্ষে শেখা সেই অ্যানাটমিই আগামী দিনে তাদের চিকিৎসা পেশার ভিত্তি। জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও সিভাসুর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, ২০১১ সাল থেকে আমরা নানা স্থান থেকে বিভিন্ন প্রাণীর কঙ্কাল, অস্থি নমুনাসহ সব প্রাণীদের স্পেসিমেন সংগ্রহ করা শুরু করি। সাত বছর কাজ করার পর এটিকে পরিপূর্ণ অ্যানাটমি মিউজিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব হয়। অ্যানাটমি মিউজিয়ামটি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষাকেন্দ্র। বইয়ে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণীর কঙ্কাল, অস্থি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সরাসরি দেখে তারা শরীরের গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হিসেবে প্রাণীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় এই জ্ঞান তাদের কাজে লাগবে। জাদুঘরটির সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এটিকে আরও কার্যকর করে তুলতে চাই।
জাদুঘরের সবচেয়ে আলোচিত সংগ্রহ জিরাফের কঙ্কালটির রয়েছে দীর্ঘ এক গল্প। ২০১৯ সালে জাতীয় চিড়িয়াখানায় জিরাফটির মৃত্যু হয়। প্রায় ছয় মাস মাটিতে পুঁতে রাখা দেহাবশেষ থেকে হাড় সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো চট্টগ্রামে এনে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হয়। একটি একটি করে হাড়ের অবস্থান নির্ধারণ করে জোড়া লাগাতে সময় লাগে প্রায় দেড় বছর।
হাতির কঙ্কাল এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়া সাফারি পার্ক থেকে। ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে এসেছে উটের কঙ্কাল। সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে মৃত অবস্থায় পাওয়া বড় একটি অজগরের কঙ্কালও রয়েছে এখানে। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি কুমির প্রজনন কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বিশাল আকৃতির কুমিরের কঙ্কাল। এর সঙ্গে বাঘ, ঘোড়া, বানর, কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীর হাড়-অস্থি মিলে যেন এক ছাদের নিচে তৈরি হয়েছে প্রাণিজগতের শরীরের বিশাল এক মানচিত্র।
শুধু কঙ্কাল নয়, প্রায় ৫০০টি রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, প্রায় ২ হাজার অস্থি, বিভিন্ন প্রাণীর ৭৫টি মডেল এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য প্রায় ৩ হাজার স্ল্যাইড রয়েছে এখানে। মানুষ, কুকুর, বিড়াল, শূকর, গরু ও মুরগির চোখ, হৃৎপিণ্ড, জরায়ু, ফুসফুস, কিডনি, স্তনসহ নানা অঙ্গসংরক্ষিত আছে। রয়েছে ডিএনএ ও ক্রোমোজোমের নমুনাও। মানুষ, ছাগল, শূকর ও খরগোশের ভ্রুণ ফরমালিনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। মিউজিয়ামে নতুন করে আনা হয়েছে তিমি মাছের কঙ্কাল। তবে তিমির পরিমাপ এতই বিশাল যে, কোনো স্থান না পাওয়ায় আপাতত জোড়া দেওয়া হয়নি।
জাদুঘরের আরেক বিস্ময় স্ট্যাফ করা প্রাণী ও পাখি। মোরগ, মুরগি, রাজহাঁস, কবুতর, কাঠঠোকরা, প্যাঁচা, তিতির, কোয়েল, খরগোশ, গিনিপিগ, কচ্ছপ, অজগর, গোখরা, বাদুড় ও হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণীকে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তুলা, রড ও জিআই তার দিয়ে ভেতরের কাঠামো তৈরি করে তার ওপর সংরক্ষিত চামড়া বসিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে পুরনো অবয়ব।
সিভাসুর শিক্ষার্থীদের কাছে এই অ্যানাটমি মিউজিয়াম এলে মৃত প্রাণীদের জাদুঘর নয়, এটি এক অদ্ভুত পাঠশালা যেখানে মৃত শরীরের ভেতর দিয়েই ভবিষ্যতের চিকিৎসকরা শিখছেন জীবনের ভাষা।