স্বল্প খরচে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার প্রত্যয় নিয়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার কলাবাগান লেক সার্কাসে যাত্রা শুরু করে লং লাইফ হাসপাতাল। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ২০ হাজারের বেশি মানুষ গত চার বছরে বিভিন্ন ধরনের সেবা নিয়েছেন। এর বাইরে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে হাসপাতাল নিয়ে জানালেন তার প্রত্যাশা, পরিকল্পনাসহ অনেক কিছু
লং লাইফ হাসপাতালের বিশেষত্ব
আবু কাউছার স্বপন : রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমিউনিটিভিত্তিক হলে সুফল পাওয়া যায়। এই দিক বিবেচনায় রেখেই লং লাইফ হাসপাতালে প্রিভেনটিভ কেয়ারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি আমরা। চিকিৎসা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য নারীদের প্রসব যাত্রাটি নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করা, নিউরোলজি চিকিৎসা, বাচ্চাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ শিশু বিভাগ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউ সেবা, আইসিইউ সেবা, বিভিন্ন ধরনের জটিল অপারেশন ও প্রসিডিউর সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
হাসপাতালে সেবার মান কেমন
আবু কাউছার স্বপন : হাসপাতাল মানে কেবল বড় ভবন, কিছু যন্ত্রপাতি আর চিকিৎসক থাকা নয়। প্রতিটি বিভাগে কেপিআই (কি-পয়েন্ট-ইন্ডিকেটরস) বজায় রাখতে হয়। এই হাসপাতালটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেবার উন্নত মান বজায় রাখার জন্য নিয়মকানুন মেনে চলার পাশাপাশি বিদেশের বড় বড় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা নেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক সহযোগিতার অফিশিয়াল চুক্তিও আমাদের রয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতর থেকে রোগ সংক্রমণ যাতে না হয়, সে দিকগুলো বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করা হয়।
বায়োমেডিকেল আবর্জনার ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো কেমন
আবু কাউছার স্বপন : লং লাইফ হসপিটালের রয়েছে নিজস্ব ইটিপি ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়াও মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সংস্থার সঙ্গে দ্বিপাক্ষীয় চুক্তিও রয়েছে।
অন্য হাসপাতাল থেকে লং লাইফের আলাদা বিশেষত্ব কী
আবু কাউছার স্বপন : আগেই বলেছি, বড় ভবন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেই ভালো হাসপাতাল হয় না। শুধু ভালো ডাক্তার, দক্ষ টেকনিশিয়ান থাকলেও হয় না। সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) সেবা ব্যবস্থাসহ মানুষের ভরসা করার মতো পরিবেশ গড়ে তুলতে হয়। মানুষকে হাসিমুখে সেবা দিতে হয়। অনেক ডাক্তারের একজন রোগীকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় নেই। এটা হতে পারে না। প্রতিটি রোগী আলাদা সমস্যা নিয়ে আসে। তাই প্রতিটি রোগীর কথা মন দিয়ে শোনা, তার আবেগ বোঝা, শুধু বোঝা নয়, তাকে আশ্বস্ত করা যে, তার সবকিছু গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হচ্ছে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে শুনতে হবে। রোগী বা তার স্বজন যদি ক্ষুব্ধ আচরণ করেন, হাসপাতাল কর্মীদের এটা বুঝতে হবে কেন মানুষটি এমন করছেন? রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং রোগীর যতœ ঠিক রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সবার আর্থিক অবস্থা হয়তো একই রকম থাকে না। কিন্তু এ ধরনের মানুষকে কী করে সেবা দেওয়া যায়, ভালো হাসপাতাল হতে হলে তাও ভাবতে হয়। সুযোগ ও মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আমরা সেবার মাধ্যমে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছি। ডাক্তারদের ওপর ল্যাবরেটরি টেস্ট দেওয়া বা রোগী ভর্তি করাসহ কোনো বিষয়েই কোনো চাপ নেই। কোনো টার্গেট দেওয়া নেই। তারা নির্ভার হয়ে যেভাবে রোগীর জন্য ভালো হয়, সে রকম পরামর্শ দিতে পারেন। এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, কারণ আমাদের হাসপাতালটি ডাক্তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত।
রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখার কোনো বিষয় কীভাবে দেখছেন।
আবু কাউছার স্বপন : খরচ অনেক হবে, এই আশঙ্কায় অনেকে হাসপাতালে যান না। অনেক রোগী টানা অনেক দিন ধরে (ক্রনিক রোগে) ভুগছেন। চিকিৎসা নেন না, কিন্তু লং লাইফ হসপিটালে একজন রিকশাচালক থেকে এলিট শ্রেণি সবার জন্যই বিভিন্ন ধাপে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতালে ভালো সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কী।
আবু কাউছার স্বপন : চিকিৎসা মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সেবার সংস্কৃতি ও মনমানসিকতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। রোগীকে বোঝা, তাকে সহানুভূতি জানানো এ দুটো আলাদা বিষয়। এক করে দেখলে চলবে না। তাকে কেন, কী পরামর্শ বা সেবা দেওয়া হচ্ছে, তার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি অবশ্যই থাকতে হবে। ডাক্তার, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ সবাইকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য এখানে সবাইকে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি নিরাপত্তাকর্মীরও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, যাতে তারা সবার সঙ্গে শান্ত ও সংযত আচরণ করেন।
আমাদের দেশে মানুষ দল বেঁধে রোগী দেখতে হাসপাতালে যায়। এটা যে রোগীর নিজের জন্য, যারা দেখতে যায় তাদের জন্য এবং যারা হাসপাতালে সেবা দেয় তাদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে, এটা অনেকে ভাবেন না।
বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ নানা কারণে চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান। আমাদের আশা, একদিন তারা বিদেশে নয়, নিজ দেশের চিকিৎসায় ভরসা পাবেন; বিদেশের চিকিৎসা ছেড়ে দেশে ফিরবেন এটাই লং লাইফ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমার চাওয়া।