ডা. মো. নজরুল ইসলাম
অধ্যাপক এবং অর্থোপেডিকস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
ভিটামিন ডি, যাকে প্রায়ই ‘সূর্যের ভিটামিন’ বলা হয়, অনেক শারীরিক ক্রিয়াকলাপের জন্য অপরিহার্য। ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, যা হাড় এবং দাঁতশক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কোষের বৃদ্ধি এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। যদিও আমাদের শরীর সূর্যের আলো থেকে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে, তবুও অনেক কারণই এই ঘাটতির কারণ হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভিটামিন ডি একটি চর্বি-দ্রবণীয় ভিটামিন, যা আমাদের শরীর দুটি প্রধান উৎস থেকে পায়। ভিটামিন ডি-এর প্রধান কাজ হলো শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা, যা সুস্থ হাড় বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে, যা হাড় গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি-এর অভাবে হাড় পাতলা, ভঙ্গুর বা বিকৃত হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শিশুদের রিকেটস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অস্টিওম্যালাসিয়ার মতো রোগ দেখা দেয়। ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে ফ্লু এবং সাধারণ সর্দির মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। পেশির কার্যকারিতার জন্যও ভিটামিন ডি জরুরি। পেশির সংকোচন নিয়ন্ত্রণে এবং পেশির শক্তি ও ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে বয়স্কদের পড়ে যাওয়া ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যে ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। ভিটামিন ডি কোলন, স্তন, প্রোস্টেট এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারসহ নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
লক্ষণ
ভিটামিন ডি-এর অভাবের সাধারণ লক্ষণ হলো ক্রমাগত ক্লান্তি এবং দুর্বলতা। পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও ব্যক্তিরা অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করেন। এই ক্লান্তি দৈনন্দিন কাজকর্মের ওপর প্রভাব ফেলে। উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক জীবনের মানকে প্রভাবিত করে। ভিটামিন ডি-এর অভাব হাড় এবং পেশি ব্যথার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী পেশিব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা এবং পিঠে ব্যথা ভিটামিন ডি-এর অপর্যাপ্ত মাত্রা নির্দেশ করতে পারে। তা ছাড়া ঘাটতিযুক্ত ব্যক্তিরা পেশি দুর্বলতা এবং অস্বস্তির কারণে সাধারণ কাজ করতে অসুবিধা অনুভব করতে পারেন।
ভিটামিন ডি-এর অভাবে ক্রমাগত দুঃখ, বিরক্তি বা উদ্বেগের অনুভূতি অনুভব করতে পারেন। চুল পড়ার জন্য বিভিন্ন কারণ দায়ী করা যেতে পারে, তবে ভিটামিন ডি-এর অভাব এই অবস্থাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ভিটামিন ডি-এর অপর্যাপ্ত মাত্রা চুলের বৃদ্ধি চক্রকে ব্যাহত করতে পারে, যার ফলে অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়া বা পাতলা হয়ে যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যার ফলে ব্যক্তিরা সর্দি, ফ্লু এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো সংক্রমণের জন্য আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ভিটামিন ডি-এর অভাব হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ভিটামিন ডি-এর অভাবে আলঝাইমার এবং ডিমেনশিয়ার মতো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ভিটামিন ডি-এর অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো শরীরে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখা, যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিন ডি-এর অভাবের ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাড় নরম হয়ে যাওয়া (অস্টিওম্যালেসিয়া) এবং শিশুদের মধ্যে রিকেটস হতে পারে, যার ফলে কঙ্কালের বিকৃতি এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ভিটামিন ডির ঘাটতি পূরণ
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি-বি (টঠ-ই) ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারসহ কিছু খাবার থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন ডির মাত্রা কম ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি খাওয়া উচিত নয়।
রোদ থেকে ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডির প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে সূর্যের আলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতক্ষণ রোদে থাকলে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হবে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। ত্বকের রঙ, বয়স, ঋতু, দিনের সময়, পোশাক এবং শরীরের কতটা অংশ রোদে উন্মুক্ত রয়েছে এসব বিষয়ের ওপর এর পরিমাণ নির্ভর করে। তাই নির্দিষ্ট ‘১০-১৫’ মিনিটের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।
সাধারণভাবে অল্প সময়ের জন্য হাত, বাহু বা পায়ের মতো শরীরের কিছু অংশে সরাসরি সূর্যের আলো লাগানো যেতে পারে। তবে ত্বক পুড়ে যাওয়ার মতো দীর্ঘ সময় রোদে থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে দিনের তীব্র রোদে অতিরিক্ত সময় থাকলে ত্বকের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। জানালার কাচের ভেতর দিয়ে পাওয়া রোদ ভিটামিন ডি তৈরির জন্য কার্যকর নয়, কারণ কাচ UV-B রশ্মির বড় অংশ আটকে দেয়। একইভাবে পোশাক দিয়ে ঢাকা ত্বকেও সূর্যের আলো ভিটামিন ডি তৈরিতে খুব কম ভূমিকা রাখে। যাদের ত্বকের রঙ গাঢ়, তাদের একই পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরিতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে। তবে অতিরিক্ত রোদে থাকার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।