যাতায়াতে সন্দ্বীপবাসীর ভোগান্তির শেষ নেই

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৮ এএম

সাগর উত্তাল। ঘাট অন্ধকারাচ্ছন্ন। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে একটি নৌযানের অপেক্ষায় স্বজনদের প্রহর গুনতে হচ্ছে। সময় গড়াচ্ছে, কিন্তু নৌযান মিলছে না। শেষ পর্যন্ত যখন পারাপারের ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন অনেকের জন্য আর চিকিৎসার সুযোগ থাকছে না। চট্টগ্রামে নেওয়ার আগেই ঘাটে থেমে যাচ্ছে জীবন। আবার কখনো উত্তাল সাগরে ছোট নৌযানে চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা, নিখোঁজ হচ্ছেন যাত্রী, পরে ভেসে উঠছে মরদেহ।

এটি কোনো এক দিনের ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে সন্দ্বীপের নৌপথে এমন ভোগান্তি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। নাব্য সংকট, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত নৌযানের অভাব এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন জরুরি রোগী, প্রসূতি ও তাদের স্বজনেরা। নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতির পরও নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন নৌযোগাযোগ নিশ্চিত না হওয়ায় সন্দ্বীপবাসীর অপেক্ষার শেষ হচ্ছে না।

১৬৫ প্রাণহানি তথ্য : ২০০১ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপ চ্যানেলে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত ১৬৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় যাত্রী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি দুই শতাধিক হতে পারে। কারণ বহু দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধার হয়নি, আবার অনেক ছোট নৌযানের দুর্ঘটনার তথ্যও সরকারি বা সংবাদমাধ্যমের নথিতে আসেনি। নিহতদের বড় অংশই সন্দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা।

সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভয়াবহতার বড় দৃষ্টান্ত ২০০১ সালের ১ জুনের ঘটনা। সীতাকু-ের আমীর মোহাম্মদ ফেরিঘাট থেকে প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে সন্দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায় একটি ট্রলার। উত্তাল সাগরের মধ্যে ডুবে যায় ট্রলারটি। এ ঘটনায় তৎকালীন সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমানের মা ও বোনসহ শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ হন।

৪ বছর পর, ২০০৫ সালের ৬ নভেম্বর গুপ্তছড়া-কুমিরা নৌরুটে ট্রলারডুবিতে মারা যান ১৬ জন। পরের বছর ২০০৬ সালের ৮ জুন একই গুপ্তছড়া-কুমিরা রুটে আবার ট্রলারডুবিতে প্রাণ হারান ২০ জন।

ঘাটে নিরাপদভাবে যাত্রী নামানোর ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের ছোট নৌযান স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘লালবোটে’ তুলে তীরে নেওয়ার সময় উল্টে গিয়ে ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল প্রাণ হারান ১৮ জন। ২০২২ সালের ২০ এপ্রিল গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় দুই যমজ বোনসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে ১২ বছর বয়সী আবদুর রহমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চট্টগ্রামে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। ১০ ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকার পর একটি নৌযানের ব্যবস্থা হলেও নৌকাতেই মারা যায় শিশুটি। চলতি বছরও সেই একই চিত্র দেখা গেছে। গত ১৯ আগস্ট অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিনকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেওয়ার চেষ্টা করেন স্বজনরা। কিন্তু গুপ্তছড়া-কুমিরা নৌরুটে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকায় তাকে নিয়ে ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

এর মাত্র কয়েক দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ৭০ বছর বয়সী ওসমান গণিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনরা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফেরি ও জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। জরুরি ভিত্তিতে স্পিডবোটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গুপ্তছড়া ঘাটেই তার মৃত্যু হয়।

২০০১ সালের ভয়াবহ ট্রলারডুবি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে সন্দ্বীপ চ্যানেলের নৌযোগাযোগ সংকটসহ কয়েকটি ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। এসব মৃত্যুর পেছনে শুধু উত্তাল সাগর নয়; দীর্ঘদিনের অনিরাপদ নৌযান, যাত্রী ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত ঘাট অবকাঠামো, নাব্য সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থার অভাবও দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা।

২০০১ সালের ১ জুনের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের একজন ছিলেন গাছুয়া রুটের যাত্রী হেদায়েতুল ইসলাম। তার ছেলে প্রবাসী তারেক বলেন, ‘বাবার লাশটাও আমরা পাইনি। এত বছর পরও সন্দ্বীপে যেতে আমাদের পুরনো আমলের কাঠের ট্রলার আর পুরনো নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়।’

শুধু নৌদুর্ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্নতাই বড় সংকট : সন্দ্বীপের মানুষের কাছে সমস্যাটি শুধু নৌযানের নয়। মূল সমস্যা হলো ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। চট্টগ্রামের মূল ভূখ- থেকে সন্দ্বীপে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় সাগর ও চ্যানেল। ফলে একটি নৌযান বন্ধ মানেই কার্যত দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখ-ের যোগাযোগ বন্ধ। বর্ষায় সাগর উত্তাল হলে সতর্ক সংকেতের কারণে ফেরি বা জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকা তো থেমে থাকে না। চিকিৎসা নিতে হবে। পণ্য আনতে হবে। ব্যবসা করতে হবে। চাকরি, শিক্ষা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চট্টগ্রামে যেতে হবে।

তখন অনেক মানুষ বাধ্য হন ছোট কাঠের ট্রলার, মালবোট কিংবা লালবোটের ওপর নির্ভর করতে। ফলে যে নৌযানগুলো স্বাভাবিক আবহাওয়ায়ও ঝুঁকিপূর্ণ, উত্তাল সাগরে সেগুলো হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক।

এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার মুমূর্ষু রোগী, প্রসূতি, শিশু ও বয়স্করা। সন্দ্বীপে জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীকে চট্টগ্রামে নিতে হয়। কিন্তু রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পরও নৌযান না পাওয়া গেলে সময় চলে যায়। কখনো ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো নৌযান মাঝপথে আটকে যায়। কখনো উত্তাল ঢেউয়ের কারণে পারাপার বন্ধ থাকে। আবার রাত হলে নিয়মিত যাত্রী পারাপারের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

ঘাটে নামতে গিয়েও বিপদ : সন্দ্বীপের দুর্ভোগ শুধু চ্যানেল পারাপারেই শেষ হয় না। ঘাটে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের মুখে। নিয়মিত ড্রেজিং না থাকায় নাব্যতা সংকটে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয় নৌযান চলাচলকে। কোথাও হাঁটুকাদা, কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে যাত্রীদের নৌযানে উঠতে হয়। নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বড় নৌযান ঘাটে পৌঁছালেও নিরাপদ জেটি না থাকায় ছোট নৌযানে যাত্রী স্থানান্তর করতে হয়। ২০১৭ সালের ১৮ প্রাণহানির ঘটনা সেই ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আইনি লড়াই হয়েছে, ক্ষতিপূরণ আটকে আছে : দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে মামলা ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বড় অংশ এখনো ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৮ জন নিহতের ঘটনায় ব্যারিস্টার জহিরুল ইসলামের করা মামলায় হাইকোর্ট বিআইডব্লিউটিসি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদকে যৌথভাবে নিহতদের পরিবারকে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরিবারপ্রতি নির্ধারণ করা হয় ১৫ লাখ টাকা। তবে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ওই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। বাদী ব্যারিস্টার জহিরুল ইসলামের ভাষ্য, মামলাটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায়। ফলে দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে প্রশ্ন থেকেই গেছে প্রাণের ক্ষতিপূরণ কি আদৌ মিলবে?

প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন কবে : সন্দ্বীপের নৌযোগাযোগ উন্নয়নের দাবি নতুন নয়। সর্বশেষ দুই বছর আগে সন্দ্বীপ পরিদর্শনের সময় তৎকালীন নৌ-উপদেষ্টা শাখাওয়াত হোসেন সব মৌসুমে চলাচল উপযোগী বা অল-ওয়েদার নৌযান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। বরং যাত্রীস্বল্পতার কারণ দেখিয়ে জনপ্রিয় সি-ট্রাক ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

‘আমরা সন্দ্বীপবাসী’ সংগঠনের নেতা সালেহ উদ্দিন নোমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ যাতায়াত এখনো নিশ্চিত হয়নি।

তার দাবি, স্রোতপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিয়মিত ড্রেজিং এবং সব মৌসুমে চলাচল উপযোগী সি-ট্রাকের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিআইডব্লিউটিসি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা (আরটিআই) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম মিশা দেশ রূপান্তর’কে বলেন, সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। শিগগির সন্দ্বীপে দুটি উন্নতমানের রোপেক্স ফেরি দেওয়া হবে। রোপেক্স ফেরি হলো এক ধরনের আধুনিক নৌযান, যা একই সঙ্গে যাত্রী এবং চাকাযুক্ত যানবাহন যেমন : গাড়ি, ট্রাক, বাস ইত্যাদি পরিবহন করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এমনকি সন্দ্বীপবাসী ঢাকা যাতায়াত করতে পারবে নৌপথে। সন্দ্বীপ, ভোলা, মনপুরাসহ আরও কয়েকটি নৌরুট পিক এবং ড্রপ পয়েন্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মানে যাত্রীরা সন্দ্বীপ থেকে ভোলা, মনপুরাসহ নানা স্থানে ভ্রমণ করতে পারবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সন্দ্বীপের সন্তান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, সারা বছর চলাচল উপযোগী নৌযান ও কোস্টাল ফেরি দেওয়ার কাজ চলছে। অচিরেই ‘নিঝুম দ্বীপ’ সি-ট্রাকটি ফেরত পাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

সেতু নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা কী এবং সেতু নির্মাণ অসম্ভব হলে তার বিকল্প সমাধান কী : এমন একটি প্রশ্নের জবাবে সেতু বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ দেশ রূপান্তর’কে বলেন, এটি একটি সামুদ্রিক চ্যানেল। উত্তাল সাগরের মধ্যে হওয়াতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক বাজেট প্রয়োজন এবং টেকসই কতটুকু তারও একটি বিষয় রয়েছে। সরকারের আর্থিক দিক, সেতু নির্মাণে কারিগরি প্রতিবন্ধকতার দিক সব মিলিয়ে এখনো বিবেচনা করা হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত সেতু নির্মাণ নিয়ে ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনা আমার জানা মতে নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত